এবার গ্যাসের ‘ঘা’


জাতীয় কণ্ঠ ডেস্ক প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ১৯, ২০২৩, ১১:০৮ পূর্বাহ্ন /
এবার গ্যাসের ‘ঘা’
নিউজটি শেয়ার করুন

আজকালের কন্ঠ ডেস্ক : গ্যাস সংকটে ঠিকমতো ঘোরে না কল-কারখানার চাকা। তবু সাত মাসের ব্যবধানে আবার গ্যাসের দাম বাড়াল সরকার। এবার এক লাফে রেকর্ড ৮২.১০ শতাংশ দাম বেড়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৫ শতাংশ বাড়ানোর এক সপ্তাহের মাথায় গ্যাসের দামও বাড়ল।

খানিকটা সুখবর হলো- বাসাবাড়ি, পরিবহন এবং সার উৎপাদনে গ্যাসের দাম এ যাত্রায় বাড়েনি। বেড়েছে শুধু বিদ্যুৎ, শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে। ফলে সব নিত্যপণ্যের দাম একযোগে বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পটভূমিতে আরেক দফা খরচের জাঁতাকলে পড়তে যাচ্ছে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।
বিদ্যুতের মতো এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের গণশুনানি ছাড়াই নির্বাহী আদেশে সরকার গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। নতুন দাম ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। গতকাল বুধবার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দাম বাড়ানোর এ ঘোষণা দেয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
খাত-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, মূলত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ পেতে ভর্তুকি কমানোর অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে সরকারের বছরে আয় বাড়বে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।

গ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বাড়বে। ফলে গ্রাহক পর্যায়েও বিদ্যুতের বাড়তি দাম গুনতে হতে পারে। গ্যাসের বর্ধিত দাম শিল্পের খরচ বাড়িয়ে দেবে, এতে দ্রব্যমূল্য আরও ছুটতে পারে। সব মিলিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবন ধারণ আরও দুরূহ হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
সরকার বলছে, পরিবহন ও আবাসিক খাতে দাম বাড়েনি। ফলে জনগণের ওপর তেমন চাপ পড়বে না। দাম বাড়ানোর ফলে এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে শিল্পে বেশি গ্যাস দেওয়া যাবে বলে মনে করছে সরকার।

দামের রেকর্ড : বর্তমানে প্রতি ঘনমিটার (প্রতি ইউনিট) গ্যাসের গড় খুচরা দর ১১ টাকা ৯০ পয়সা। এটা বেড়ে এখন গড় দাম প্রতি ঘনমিটারে দাঁড়িয়েছে ২১ টাকা ৬৭ পয়সা। বেড়েছে ৮২.১০ শতাংশ। এটা রেকর্ড। ২০০৯ সালে প্রতি ঘনমিটারের গড় দাম ছিল ৪ টাকা ৩৪ পয়সা। তখন থেকে এ পর্যন্ত গ্রাহক পর্যায়ে ছয়বার গ্যাসের দাম বেড়েছে।

গত সাড়ে ১৩ বছরে এই বৃদ্ধির হার ৪০০ শতাংশ। এর মধ্যে ২০০৯ সালের জুলাইয়ে গড়ে ১১.২২%, ২০১৫ সালের ১ আগস্ট ২৬.২৯%, ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২২.৭০%, ২০১৯ সালের ১ জুলাই ৩২.০৮% এবং ২০২২ সালের ৫ জুন ২২.৭৮% বাড়ে গ্যাসের দাম।
শিল্প ও বিদ্যুতে খরচ বাড়বে : নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহূত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৫ টাকা ২ পয়সা থেকে ৮ টাকা ৯৮ পয়সা বেড়ে ১৪ টাকা হয়েছে (বৃদ্ধি ১৭৯%)। শিল্প-কারখানার ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনের গ্যাসের দাম প্রতি ইউনিটে ১৬ টাকা থেকে ১৪ টাকা বেড়ে ৩০ টাকা হয়েছে (বৃদ্ধি ৮৮%)। বৃহৎ শিল্পের ক্ষেত্রে ১১ টাকা ৯৮ পয়সা থেকে ১৮ টাকা ২ পয়সা বেড়ে ৩০ টাকা হয়েছে (বৃদ্ধি ১৫০.৪১%)। মাঝারি শিল্পে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ১১ টাকা ৭৮ পয়সা থেকে ১৮ টাকা ২২ পয়সা বেড়ে ৩০ টাকা করা হয়েছে (বৃদ্ধি ১৫৪.৬৭ %)। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে ১০ টাকা ৭৮ পয়সা থেকে ১৯ টাকা ২২ পয়সা বেড়ে হয়েছে ৩০ টাকা (বৃদ্ধি ১৭৮.২৯%)। এ ছাড়া হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং অন্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বেলায় গ্যাসের দর হবে ৩০ টাকা ৫০ পয়সা, যেখানে এত দিন দাম ছিল ২৬ টাকা ৬৪ পয়সা (বৃদ্ধি ১৪%)।

অর্থনীতিবিদ এবি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণে শিল্পের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। দ্রব্যমূল্য আরও বাড়বে। উস্কে দেবে মূল্যস্ম্ফীতি। মানুষের জীবনযাপন কষ্টকর হয়ে পড়বে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন সমকালকে বলেন, বর্তমান অস্থিতিশীল বিশ্ববাজারে এমনিতেই নানা সমস্যায় আছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। এর মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারিসহ সব শিল্পে গ্যাসের দাম তিন গুণের কাছাকাছি বাড়ানো হয়েছে। এটা শিল্পোদ্যোক্তাদের বড় চাপে ফেলবে। এতে সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। রপ্তানিমুখী শিল্পে উৎপাদিত পণ্য বিশ্ববাজারে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। অস্তিত্ব সংকটে পড়বে ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলো।

শিল্পে উৎপাদিত নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রের (ক্যাপটিভ) গ্যাসের দামের ব্যাপারে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, এ খাতে প্রতি ইউনিটের দাম ২৫ টাকা করার জন্য ব্যবসায়ীরা সম্মতি দিয়েছেন। তবে তা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ টাকা। বাকি ৫ টাকা সরকারকে সমন্বয় করার অনুরোধ জানান তিনি।

জানতে চাইলে বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমের সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন সমকালকে বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ার কারণে সুতা ও কাপড় উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হবে। এত বেশি উৎপাদন ব্যয়ে কোনো শিল্প টিকতে পারে না। কারণ, বস্ত্র ও পোশাক খাত আন্তর্জাতিক ব্যবসা। বিশ্ববাজারের দরের সঙ্গে তাল মেলাতে হয়। চাইলেই রড-সিমেন্টের মতো দর বাড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, গ্যাসই হচ্ছে বস্ত্র খাতের প্রধান কাঁচামাল। এখন গ্যাসের অস্বাভাবিক বর্ধিত দরে শিল্প মার খাবে। বস্ত্রের সংকটে তৈরি পোশাক খাতও সংকটে পড়বে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বলছে, নভেম্বরে পাইকারিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরও লোকসান দিতে হচ্ছে। সরকার এ বছর বিদ্যুৎ খাতে ১৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ রেখেছে। তবে জ্বালানির দাম বাড়ায় ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ৪৪ হাজার কোটি টাকা। নতুন করে গ্যাসের দাম বাড়ায় ঘাটতি আরও বেড়ে যাবে। তাই আবার বাড়তে পারে বিদ্যুতের দাম।

গ্যাস নেই, তবু এত দাম : দাম বাড়ানোর বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ব্যবসায়ীরা বেশি দাম দিয়ে হলেও গ্যাস চাইছেন। সরবরাহ স্বাভাবিক করতে এলএনজি (তরল প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি বাড়াতে হবে। এ জন্য বাড়তি টাকা প্রয়োজন। সরকার ভর্তুকি দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। আইএমএফের ঋণ পেতে ভর্তুকি কমাতে হবে। সব মিলিয়ে গ্যাস খাতের খরচ তুলতেই দাম বাড়ানো হয়েছে।

এর আগেও আমদানি করে সরবরাহ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে দুই দফা (২০১৯ ও ২০২২ সালে) গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছিল। পরে গ্যাস আমদানি বাড়েনি; বরং গত জুলাই থেকে সরকার খোলাবাজার থেকে এলএনজি কেনা বন্ধ রেখেছে। ফলে আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ দিনে ৮৫ কোটি ঘনফুট থেকে ৪০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। তাই এবারও দাম বাড়ানো হলে চাহিদা অনুসারে গ্যাস মিলবে কিনা, তা নিয়ে ধূম্রজালে খাত-সংশ্নিষ্টরা।

দেশে দিনে এখন গ্যাসের মোট চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এলএনজিসহ গড়ে সরবরাহ করা হয় ২৬৬ কোটি ঘনফুট।

ভুগবে জনতা: কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এম শামসুল আলম বলেন, গত জুনে এক দফা গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে বাসাবাড়ি ও শিল্পে কেউ গ্যাস পাচ্ছে না। এলএনজি আমদানির কথা বলে গত চার বছরে দু’দফা গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। এতে কয়েক হাজার কোটি টাকা বিতরণ কোম্পানিগুলোর পকেটে ঢুকেছে। যে খাতেই দাম বাড়ূক, শেষ পর্যন্ত তা ভোক্তার ঘাড়েই চাপে। তিনি বলেন, বিতরণ কোম্পানিগুলোর অনিয়ম ও অপচয় বন্ধ করলেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতো না।

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হোসেন বলেন, নানা কারণে এখন হোটেল-রেস্তোরাঁর ব্যবসা মন্দা যাচ্ছে। সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বাড়াল। এখন বাড়ল গ্যাসের দাম। এতে খরচ অনেক বেড়ে যাবে। তিনি বলেন, সামনে খাবারের দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। এতে গ্রাহক কমে যাবে। সে ক্ষেত্রে হোটেল-রেস্তোরাঁর মালিকরা লোকসানের মুখে পড়বেন।

জ্বালানি বিভাগের ব্যাখ্যা: ভর্তুকি সমন্বয় ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতেই ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের দাম সমন্বয় হয়েছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বর্তমান বৈশ্বিক বিশেষ জ্বালানি পরিস্থিতিতে ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের জ্বালানির দাম অস্থিতিশীল। এ ছাড়া, জ্বালানিসংশ্নিষ্ট অন্যান্য ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্ববাজারে এলএনজির আমদানি মূল্যও অস্বাভাবিক বেড়েছে। ফলে এ খাতে সরকারকে বিপুল ভর্তুকি দিতে হচ্ছিল। সে কারণে গত জুলাই থেকে স্পট মার্কেটে এলএনজি আমদানি বন্ধ রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ, শিল্পসহ সব খাতে গ্যাস রেশনিং করা হচ্ছে।

চলমান কৃষি সেচ মৌসুম, আসন্ন রমজান ও গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের বর্ধিত চাহিদা মেটানো, শিল্প খাতে উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখার করণীয় সম্পর্কে সব অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়। যেহেতু স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করে ওই বর্ধিত চাহিদা পূরণ করতে হবে, সে কারণে সরকার বিদ্যুৎ, শিল্প ক্যাপটিভ বিদ্যুতে ও বাণিজ্যিক খাতে ব্যবহূত গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে।