সংরক্ষিত নারী আসন: বঞ্চিতদের প্রাধান্য দেবে আওয়ামী লীগ


Emu Akter প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ২১, ২০২৪, ৮:৫৯ পূর্বাহ্ন /
সংরক্ষিত নারী আসন: বঞ্চিতদের প্রাধান্য দেবে আওয়ামী লীগ
নিউজটি শেয়ার করুন

দ্বাদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনগুলোতে প্রার্থী মনোনয়নে ‘বঞ্চিত’দের প্রাধান্য দেবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এবারের জাতীয় নির্বাচনে যাঁরা দলের মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন, যাঁরা দলের মনোনয়ন পেয়ে পরে জোটের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন, তাঁদের অনেকেই সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হতে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে এমনটা জানিয়েছেন।

দলের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের একাধিক নেতা জানান, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ৫-৭ জন নেতা সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হতে পারেন।

জেলা পর্যায়ে দীর্ঘদিন দলের সঙ্গে আছেন এমন কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে। সহযোগী সংগঠন মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগের একাধিক সাবেক ও বর্তমান নেত্রীকে সংসদ সদস্য করা হতে পারে।

দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, দলের সক্রিয় নেত্রীদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের জন্য পারিবারিক অবদান বিবেচনায় একাধিক নারীকে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য করা হবে। সাংস্কৃতিক ও চলচ্চিত্র অঙ্গন থেকে একজনকে সংসদ সদস্য করার সম্ভাবনা বেশি। জেলা কোটা বিবেচনায়ও স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজনের নাম দলের ভেতর আলোচনায় রয়েছে।

দলের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, একজন যেন বারবার সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য না হোন সেদিকটা খেয়াল রাখতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা সুপারিশ করেছেন। ফলে একাধিকবার যাঁরা সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হয়েছেন এবার তাঁদের বেশির ভাগই বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান কাজী জাফর উল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একজন যেন বারবার সংসদ সদস্য না হয়, সেদিকটা আমরা বিবেচনা করব।

প্রার্থী মনোনয়নে যাঁরা দীর্ঘদিন দলের জন্য কাজ করছেন, যাঁদের মা-বাবার দলের জন্য অবদান রয়েছে—এই বিষয়গুলো গুরুত্ব দেওয়া হবে।’

নির্বাচন কমিশনের একটি সূত্রে জানা যায়, আগামী ৩০ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসতে যাচ্ছে। এর সপ্তাহখানেকের মধ্যেই সংরক্ষিত আসনের ভোট হতে পারে। জাতীয় সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত আসন রয়েছে। ৩০০ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যদের নির্বাচিত করবেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কারা কতটা আসন পেয়েছে, তার অনুপাতে তারা সংরক্ষিত আসন পাবে। প্রতি ছয় আসনের বিপরীতে একটি করে সংরক্ষিত আসন বণ্টন করা হয়ে থাকে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও এই অনুপাতেই সংরক্ষিত আসন পাবেন।

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট হয়েছে। একটির ভোট স্থগিত আছে। ২৯৯ আসনের  মধ্যে আওয়ামী লীগ ২২৩টি আসনে জয় পেয়েছে। জাতীয় পার্টি ১১টি আসনে জয় পেয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৬২ আসনে জয় পেয়েছেন। স্বতন্ত্র সবাই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে সংখ্যার অনুপাত হিসেবে এবার আওয়ামী লীগ অন্তত ৩৭টি ও স্বতন্ত্ররা ১০টি সংরক্ষিত আসন পাবে। তবে সংসদ বসার পরে স্বতন্ত্ররা আওয়ামী লীগে যোগ দিলে আসন বণ্টনের হিসাব পরিবর্তন হয়ে যাবে। তখন আওয়ামী লীগ সব মিলিয়ে ৪৮টি সংরক্ষিত আসন পাবে। জাতীয় পার্টি দুটি আসন পাবে।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, স্বতন্ত্ররা সংসদে আওয়ামী লীগে যোগ দিক বা না দিক, তাঁদের সমর্থনে সংরক্ষিত আসনে আওয়ামী লীগের নেত্রীদেরই সংসদ সদস্য করা হবে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সংরক্ষিত আসনের একটি তালিকা করে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের সমর্থন চাওয়া হতে পারে।

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে দলের মনোনয়ন পেয়েছিলেন আওয়ামী লীগের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী। পরে ১৪ দলের শরিকদের সঙ্গে সমঝোতার ফলে আসনটিতে জাসদ নেতা মোশাররফ হোসেনকে নৌকা প্রতীক দেওয়া হয়। ফলে ফরিদুন্নাহার লাইলীকে নির্বাচন থেকে সরে যেতে হয়। তাঁকে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য করা অনেকটাই নিশ্চিত বলে জানিয়েছে দলের একাধিক সূত্র।

আওয়ামী লীগের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাকে এ বিষয়ে দল থেকে এখনো কিছু জানানো হয়নি। দলের সভাপতি শেখ হাসিনা আমার বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত দেবেন আমি সেটাই মেনে নেব।’

১৪ দলের শরিক জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার গত দুই মেয়াদে ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। এবার তাঁকে জোটের মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। নির্বাচনের আগে আসন সমঝোতার সময়ে শিরীন আখতারকে আওয়ামী লীগের কোটায় সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। সে হিসেবে তাঁকে এবারে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

খুলনা-৩ আসনে কয়েকবার সংসদ সদস্য ছিলেন সাবেক শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান। এবার তাঁকে মনোনয়ন দেয়নি আওয়ামী লীগ। সেখানে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। মনোনয়ন বঞ্চিত মন্নুজান সুফিয়ানকে এবার সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য করা হতে পারে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেত্রীর নাম সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। তাঁরা হলেন আন্তর্জাতিক সম্পাদক শাম্মী আহমেদ, শিক্ষা ও মানবসম্পদবিষয়ক সম্পাদক শামসুন্নাহার চাঁপা, স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রোকেয়া সুলতানা, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য সানজিদা খানম ও তারানা হালিম।

নাটোর-৪ আসনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন যুব মহিলা লীগের সাবেক সহসভাপতি কোহেলী কুদ্দুস মুক্তি। তাঁর বাবা প্রয়াত আব্দুল কুদ্দুস নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও নাটোর-৪ আসনের কয়েকবারের সংসদ সদস্য ছিলেন। কোহেলী কুদ্দুস মুক্তিকে এবার সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দেখা যেতে পারে। তিনি বর্তমানে নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য।

চাঁদপুর-২ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য জাকিয়া সুলতানা শেফালী। জেলা কোটায় তাঁকে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য করা হতে পারে।

সংরক্ষিত আসনে আলোচনায় আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পুত্র শেখ কামালের স্ত্রী শহীদ সুলতানা কামালের ভাতিজি নেহরিন মোস্তফা দিশি। তিনি ঢাকা-৬ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। দিশি আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপকমিটির সদস্য।

মুক্তিযুদ্ধের শহীদ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দুজন জোরালো আলোচনায় আছেন। তাঁরা হলেন শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লা কায়সারের মেয়ে শমী কায়সার ও সুরকার আলতাফ মাহমুদের মেয়ে শাওন মাহমুদ।

চলচ্চিত্র অঙ্গনের মধ্য থেকে একজনকে সংসদ সদস্য করা হতে পারে। অভিনয় জগতের অনেকেই সংসদ সদস্য হওয়ার দৌড়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে অভিনেত্রী অরুণা বিশ্বাস, রোকেয়া প্রাচী, তারিন জাহান, তানভীন সুইটি, চিত্রনায়িকা নিপুণ ও মাহিয়া মাহি প্রমুখ।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘সংরক্ষিত আসনে দক্ষ, সৎ, ত্যাগী নেতারা গুরুত্ব পাবেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, আগুন সন্ত্রাসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এমন কাউকে বা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যোগ্য কাউকে পাওয়া গেলে তাঁদের কথাও বিবেচনা করবে আওয়ামী লীগ।’