৮ এপ্রি ২০২৬, বুধ

মেরু অঞ্চলের আকাশে রঙের যে মায়াবী নাচ আমরা অরোরা বা মেরুজ্যোতি হিসেবে দেখি, তার পেছনের রহস্য এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এই মনোমুগ্ধকর আলোর নেপথ্যে যে বৈদ্যুতিক প্রবাহ কাজ করে, তা কীভাবে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে ছড়িয়ে পড়ে, তা নিয়ে জানতে আগ্রহী বিজ্ঞানীরা। আর তাই অরোরা সৃষ্টির সেই জটিল বৈদ্যুতিক মানচিত্র তৈরি করতে এবার এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা।
অরোরা সৃষ্টির সেই জটিল বৈদ্যুতিক মানচিত্র তৈরির জন্য আলাস্কার পোকার ফ্ল্যাট রিসার্চ রেঞ্জ থেকে দুটি রকেট উৎক্ষেপণ করেছে নাসা। এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে জিএনইআইএসএস। এ অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো অরোরার ভেতর দিয়ে রকেট পাঠিয়ে অনেকটা সিটি স্ক্যান পদ্ধতির মতো একটি ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে সিটি স্ক্যান যেমন শরীরের ভেতরের কোষ বা হাড়ের গঠন বুঝতে সাহায্য করে, নাসার এই অভিযানেও অনেকটা একই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। অভিযানে দুটি রকেট একসঙ্গে পাশাপাশি উড়বে। অরোরার উজ্জ্বল আলোকচ্ছটার ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিটি রকেট চারটি করে ছোট ছোট সাবপেলোড বা যন্ত্রাংশ অবমুক্ত করবে।

এই যন্ত্রাংশগুলো রকেট থেকে আলাদা হয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে ছড়িয়ে পড়বে এবং সেখান থেকে পৃথিবীতে থাকা স্টেশনে রেডিও সংকেত পাঠাচ্ছে। অরোরার ভেতরে থাকা আয়নিত গ্যাস বা প্লাজমার ঘনত্বের কারণে এই রেডিও সংকেতগুলো বাধাগ্রস্ত বা পরিবর্তিত হবে। বিজ্ঞানীরা সেই সংকেতের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেই বুঝতে পারবেন, অরোরার ভেতরে ইলেকট্রনগুলো কোন দিকে এবং কত ঘনত্বে প্রবাহিত হচ্ছে।

ডার্টমাউথ কলেজের অধ্যাপক ক্রিস্টিনা লিঞ্চ বলেন, ‘আমরা কেবল রকেট কোথায় উড়ছে, তা জানতে আগ্রহী নই; বরং বায়ুমণ্ডলের নিচ দিয়ে এই বিদ্যুৎপ্রবাহ কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে তা দেখতে চাই। এটি মূলত বায়ুমণ্ডলের প্লাজমা স্তরের একটি বড় আকারের সিটি স্ক্যান। মহাকাশ থেকে আসা ইলেকট্রনগুলো পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র বরাবর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে গ্যাসে ধাক্কা দেওয়ার ফলে অরোরা সৃষ্টি হয়। ফলে আমরা উজ্জ্বল আলো দেখি। কিন্তু এই ইলেকট্রনগুলো ঠিক কীভাবে আবার ফিরে যায় বা সার্কিট পূর্ণ করে, তা এখনো বড় প্রশ্ন।

বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে বিদ্যুৎপ্রবাহের ফলে সেখানে তাপ উৎপন্নের পাশাপাশি বাতাসের তীব্রতা বা টার্বুলেন্স তৈরি হয়। এটি পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের কার্যকারিতা নষ্ট করতে পারে। এমনকি জিপিএস এবং যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে। নাসার ইজি স্যাটেলাইটের তথ্যের সঙ্গে এই রকেট অভিযানের তথ্য মিলিয়ে দেখলে মহাকাশবিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জিএনইআইএসএস অভিযানের পাশাপাশি নাসা আরেকটি রকেট পাঠাবে ব্ল্যাক অরোরা নিয়ে গবেষণার জন্য। আকাশে মেরুজ্যোতির উজ্জ্বল আলোর মধ্যে কখনো কখনো কিছু অন্ধকার অংশ দেখা যায়, যা বিজ্ঞানীদের কাছে দীর্ঘদিনের রহস্য। ধারণা করা হয়, এই কালো অঞ্চলেই বিদ্যুৎপ্রবাহের দিক হঠাৎ পরিবর্তিত হয়।
সূত্র: নাসা ও গ্যাজেট৩৬০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *