সারা দেশে ৪২ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৪ হাজার ৭৭০টিই ঝুঁকিপূর্ণ ও অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থাৎ প্রায় ৫৭ শতাংশ ভোটকেন্দ্রই ঝুঁকিতে। ভোটের আগে এ তথ্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রগুলো আরো জানিয়েছে, নির্বাচনের দিন পর্যন্ত সংঘর্ষ, হামলা ও নাশকতার আশঙ্কা রয়েছে।
সেই সঙ্গে জঙ্গি হামলার বিষয়েও সতর্ক তারা। জেল-পলাতক জঙ্গিদের পাশাপাশি দাগি অপরাধীদের ব্যবহার করে কেউ কেউ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে পারে। এ ছাড়া নির্বাচনের মাঠে থাকা বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্রও নির্বাচনী সহিংসতায় ব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) গত ১০ দিনের প্রতিবেদন বলছে, নির্বাচন সামনে রেখে গত ১০ দিনে ৫৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
এসব ঘটনায় দুজন নিহত ও ৪৮৯ জন আহত হয়। রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা বাড়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটিও।
এ বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া সেন্টারে মহাপুলিশ পরিদর্শক-আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, ‘প্রার্থীদের অবস্থান, দুর্গম এলাকা, ভোটারদের মনোভাব, আধিপত্য এসব বিষয়সহ বিভিন্ন বিষয় মাথায় রেখে এবার আট হাজার ৭৭০টি কেন্দ্র ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া মাঝারি ঝুঁকিতে রয়েছে ১৬ হাজার কেন্দ্র।’
আইজিপি বাহারুল আলম আরো বলেন, এবারের নির্বাচনে সারা দেশের প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে স্থির বা স্ট্যাটিক ফোর্স, ভ্রাম্যমাণ বা মোবাইল টিম ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য স্ট্রাইকিং টিম থাকবে। ঝুঁকি বিবেচনা করে এরই মধ্যে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কেন্দ্রে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। এসব কেন্দ্রের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এবারের ভোটে পুলিশের নিয়োজিত মোট সংখ্যা এক লাখ ৫৭ হাজার ৮০৫ জন। এর মধ্যে কেন্দ্রে স্থির বা স্ট্যাটিক ফোর্স হিসেবে ৯৩ হাজার ৩৯১ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এছাড়া সাপোর্ট বা সহায়তাকারী পুলিশের সংখ্যা থাকবে ২৯ হাজার ৭৯৮ জন। এ হিসাবে নির্বাচনে পুলিশের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় মোট মোতায়েন থাকবে এক লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন।
আইজিপি বলেন, এবার ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় প্রযুক্তির ব্যবহারে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বডি ক্যামেরার পাশাপাশি ড্রোন ব্যবহার করা হবে। এ ছাড়া পুলিশ সুপাররা তাঁদের সক্ষমতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ড্রোন ক্যামেরা ব্যবহার করবেন।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, এ বছর রাজধানীতে এক হাজার ৬১৪টি ভোটকেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ। এসব কেন্দ্রে ন্যূনতম চারজন করে এবং সাধারণ ৫১৭টি কেন্দ্রে তিনজন করে পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। ভোটকেন্দ্রের পরিস্থিতি কন্ট্রোলরুমের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণের জন্য থাকবে বডিওর্ন ক্যামেরা। ভোটকেন্দ্রের বাইরে নিরাপত্তার জন্য থাকবে ১৮০টি স্ট্রাইকিং টিম ও ৫১০টি মোবাইল টিম।
উদ্ধার না হওয়া অস্ত্র থ্রেট : কাঙ্ক্ষিত অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া প্রসঙ্গে আইজিপি বলেন, ‘এখনো এক হাজার ৩৩০টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। ব্যক্তিগত অস্ত্র এখনো এক হাজারের মতো উদ্ধার হয়নি। তবে যেকোনো অবৈধ অস্ত্রই হুমকি। এর বাইরেও বিভিন্নভাবে অস্ত্র দেশে প্রবেশ করে। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে করার লক্ষ্যে বৈধ অস্ত্রের বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখরভাবে যেন ভোটগ্রহণ হয়, সে জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে : এবারের নির্বাচনে তিন ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে আইজিপি বলেন, তফসিল ঘোষণার পর থেকে বিশেষ করে ১১ ডিসেম্বর থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩১৭টি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন পাঁচজন, আহত হন ৬০৩।
প্রার্থীদের প্রচারে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা ছিল জানিয়ে আইজিপি বলেন, ‘এখনো সেই শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এর আগে কেরানীগঞ্জের ( মাদরাসায় বিস্ফোরণ) হামলার ব্যাপারে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।’
পুলিশে এখনো পুরনো ফোর্সই রয়েছে : সম্প্রতি শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের বিষয়ে আইজিপি বলেন, ‘পুলিশে এখনো পুরনো ফোর্সই রয়েছে। তবে আমরা ভালো পুলিশিং করার চেষ্টা করছি। ৫ আগস্টের পর পুলিশের ধৈর্য দেখেছেন। এর পরও কিছু ঘটনা ঘটেছে। রাস্তা বন্ধ করে রাখা হয়েছে কত দিন। পুলিশকে মেরেছে, তবু পাল্টা আঘাত করা হয়নি। আমাদের দুর্বলতা আছে, এর পরও আমরা চেষ্টা করছি।
তিন হাজার শ্যুটার নির্বাচনের মাঠে : সাম্প্রতিক সময়ে তিন হাজার অপরাধী ও ৩৫২ জন ‘শ্যুটারের’ তালিকা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে আইজিপি বলেন, ‘এই তালিকাটি কার, সেটা আমি নিশ্চিত নই। সংখ্যা তিন হাজার বেশি বা কম হতে পারে। তবে ১৮ কোটি মানুষের দেশে এই সংখ্যক অপরাধী নির্বাচন বানচাল করতে পারবে এমন আশঙ্কা নেই। কোথাও বিচ্ছিন্ন অপরাধ, ডাকাতি বা হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে; কিন্তু তা পুরো নির্বাচনকে ব্যাহত করার মতো শক্তি এখন নেই।’
সারা দেশের কারাগার থেকে ৫ আগস্ট ভয়ংকর কিছু অপরাধী বের হয়ে গেছে, তারা নির্বাচনের দিন কোনো প্রভাব ফেলবে কি না জানতে চাইলে আইজিপি বলেন, সাজাপ্রাপ্ত কিছু অপরাধী পালিয়ে গেলেও পুলিশ সজাগ রয়েছে। তারাই উল্টো দৌড়ের ওপর আছে।
পুলিশ কি নিরপেক্ষ থাকবে : পুলিশ কি ভোটের মাঠে নিরপেক্ষ থাকবে জানতে চাইলে আইজিপি বলেন, ‘আমরা নিরপেক্ষ কি না? দেখতে পারবেন। এর পরেও দু-একজন দুষ্টুপ্রকৃতির থাকতে পারে। তারা চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ঢাকা মহানগরীর আটটি ডিভিশনে আটটি পৃথক কন্ট্রোল রুম এবং চারটি বিশেষ কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হবে। সুবিধাজনক স্থানে মোতায়েন থাকবে স্পেশাল রিজার্ভ ফোর্স। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরাসরি নেতৃত্বে থাকা এসব ফোর্স প্রয়োজনে দ্রুত যেকোনো স্থানে মোতায়েন করা যাবে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য সোয়াট, বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, ডগ স্কোয়াড, ক্রাইমসিন ভ্যান ও অশ্বারোহী পুলিশ মোতায়েন থাকবে।’

