১০ ফেব্রু ২০২৬, মঙ্গল

ইতিহাসের জীবন্ত স্মারক চাঁদ মিয়ার বাড়ি

টাঙ্গাইলের করটিয়া জমিদার বাড়ি শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়, এটি ইতিহাসের জীবন্ত স্মারক। কিন্তু অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণে সেই ইতিহাস আজ অস্তিত্ব সংকটে। কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আগামী প্রজন্ম হয়তো করটিয়া জমিদার বাড়ির নামই পড়বে শুধু বইয়ের পাতায়।

টাঙ্গাইল শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে করটিয়ায় দাঁড়িয়ে আছে এই ঐতিহাসিক স্থাপনা। উনিশ শতকের শেষভাগে করটিয়ার জমিদার পরিবার এই স্থাপনাটি নির্মাণ করে। ইউরোপীয় ও মোগল স্থাপত্যরীতির মিশেলে নির্মিত ভবনটিতে রয়েছে প্রশস্ত বারান্দা, সুউচ্চ খিলান, দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ। এক সময় এখানে বসত জমিদারি আদালত, অনুষ্ঠিত হতো সামাজিক বিচার ও উৎসব। যদিও সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে এর নকশা ও কারুকাজ ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

জমিদার বাড়িটি প্রায় ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ০.৫ কিলোমিটার প্রস্থ বিশিষ্ট প্রাচীরঘেরা। যেখানে রয়েছে লোহার ঘর, রোকেয়া মহল, রাণীর পুকুরঘাট, ছোট তরফ দাউদ মহল ও বাড়িসংলগ্ন মোগল স্থাপত্যের আদলে গড়া মসজিদ।

‘আটিয়ার চাঁদ’ নামক গ্রন্থ থেকে জানা যায়, আফগান অধিপতি সোলায়মান খান পন্নী কররানির ছেলে বায়েজিদ খান পন্নী ভারতে এসেছিলেন। তার ছেলে সাঈদ খান পন্নী আটিয়ায় বসতি স্থাপন করেন। তিনি ১৬০৮ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে আটিয়ার বিখ্যাত মসজিদ নির্মাণ করেন। এই বংশেরই ১১তম পুরুষ সা’দত আলী খান পন্নী টাঙ্গাইলের করটিয়ায় এসে পন্নী বংশের ভিত প্রতিষ্ঠা করেন। পন্নী পরিবারের ১৩তম পুরুষ দানবীর জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী আটিয়ার চাঁদ হিসাবে খ্যাত। তিনি অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করায় ১৯২১ সালের ১৭ ডিসেম্বর কারাবন্দি হয়েছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তার অনমনীয় মনোভাব ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ আজও লন্ডন মিউজিয়ামে সংরক্ষিত ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর তৈলচিত্রের নিচে লেখা রয়েছে ‘ওয়ান হু ডিফাইড দ্য ব্রিটিশ।’ ১৯২২ সালে জেল থেকে মুক্ত হয়ে তিনি সমাজ ও শিক্ষা সংস্কারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯২৬ সালে তিনি করটিয়ায় সা’দত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, যা টাঙ্গাইলের প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যেখানে টাঙ্গাইল ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলার শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছেন। কলেজের পাশাপাশি তিনি স্থাপন করেন রোকেয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, এইচএম ইনস্টিটিউশন (স্কুল অ্যান্ড কলেজ) এবং দাতব্য চিকিৎসালয়সহ জনকল্যাণকর বহু প্রতিষ্ঠান। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব ব্যয় নির্বাহের অভিপ্রায়ে তিনি তার সব সম্পত্তি দান করেন। কলেজছাত্র মনিরুজ্জামান শাকিল বলেন, বিভিন্ন বই থেকে করটিয়া জমিদার বাড়ি সম্পর্কে কিছুটা জেনেছি। তবে এই জমিদার বাড়ির ভেতরের অংশ দেখার জন্য কয়েকবার এসে ঘুরে গেছি। সব সময় গেটে তালা দেওয়া থাকে। তাই আমার মতো যারা শিক্ষার্থী, যারা ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে চায়, তাদের জন্য এই জমিদার বাড়ির গেট খুলে দেওয়া উচিত। স্থানীয় কলেজ শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, বাংলার জমিদারি ইতিহাসে করটিয়া জমিদার বাড়ি একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। এই জমিদার বাড়ি এক সময় শুধু ক্ষমতা ও ঐশ্বর্যের প্রতীকই ছিল না, ছিল প্রশাসনিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। লাল মিয়া নামের স্থানীয় এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, এই জমিদার বাড়ির সঙ্গে আমাদের শৈশব, ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ঠিকমতো সংরক্ষণ করলে এটি টাঙ্গাইলের বড় পর্যটনকেন্দ্র হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *