২৩ ফেব্রু ২০২৬, সোম

ইফতারে কোন খাবার স্বাস্থ্যের জন্য বেশি উপকারী, জেনে নিন

পবিত্র মাহে রমজানে সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতার করা হয়। আর দিন শেষে ইফতার শুধু পেট ভরানোর বিষয় নয়; এটি শরীর ও মনের ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমরা শুধু ক্ষুধা নিবারণের জন্য ইফতার করি না। এটি শরীরকে পুনরায় শক্তি জোগানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সচেতনভাবে পুষ্টিকর, হালকা ও প্রাকৃতিক খাবার বেছে নিলে রোজার ক্লান্তি দূর হয়, শক্তি ফিরে আসে এবং সুস্থ থাকা সহজ হয়। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর হঠাৎ ভারি, ভাজাপোড়া কিংবা অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার খেলে হজমের সমস্যা, অম্বল, গ্যাস্ট্রিক— এমনকি রক্তে শর্করার তারতম্য দেখা দিতে পারে। তাই ইফতারের খাবার নির্বাচন হওয়া উচিত সচেতন ও পুষ্টিকর। সারাদিনের সংযম যেন ইফতারের সময় অসচেতন খাদ্যাভ্যাসে নষ্ট না হয়, সেই সচেতনতাই হতে পারে স্বাস্থ্যকর রমজানের চাবিকাঠি।
ইফতারে থাকতে পারে খেজুর, পানি, তাজা ফল, শরবত (লেবুর/ইসবগুল), দই-চিড়া ও স্যুপের মতো সহজপাচ্য খাবার, যা স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে উপকারী। সেই সঙ্গে ভাজাপোড়া এড়িয়ে প্রোটিন ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খান। যেমন—ছোলা, ডাল, বাদাম, ওটস, গ্রিলড চিকেন বা মাছ খাওয়া উচিত, যা দীর্ঘক্ষণ শক্তি জোগায়, শরীর আর্দ্র রাখে এবং হজমে সহায়ক। খেজুর প্রাকৃতিক শর্করার উৎস এবং দ্রুত শক্তি দেয়, যা ইফতারের শুরুতে খাওয়া উত্তম। সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে।

ইফতারের শুরুতে খেজুর মুখে দেওয়ার পর রঙিন কৃত্রিম শরবতের বদলে ঘরে তৈরি লেবুর শরবত ও তেঁতুলের শরবত বা ডাবের পানি বেছে নেওয়া ভালো। অতিরিক্ত চিনি শরীরে অপ্রয়োজনীয় ক্যালোরি যোগ করে। ডাবের পানি প্রাকৃতিক ইলেক্ট্রোলাইটের ভালো উৎস, যা সারাদিনের পানিশূন্যতা দূর করতে সহায়ক।

চলুন জেনে নেওয়া যাক, ইফতারে কী ধরনের খাবার রাখা উচিত, কেন রাখা উচিত এবং কীভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ইফতার খাওয়া উচিত—

ইফতারে মৌসুমি ফল রাখা খুবই উপকারী। যেমন তরমুজ, পেঁপে, আপেল, কলা, কমলা ইত্যাদি। ফলে থাকে প্রাকৃতিক চিনি, যা ধীরে ধীরে শক্তি জোগায়। এসব ফলে প্রচুর পরিমাণে পানি ও আঁশ থাকায় হজম ভালো হয়। সেই সঙ্গে ভিটামিন ও খনিজ শরীরের ঘাটতি পূরণ করে।

আর ইফতারে পেঁয়াজু, বেগুনি, চপ, জিলাপি খুব জনপ্রিয়। তবে এগুলো অতিরিক্ত তেলে ভাজা ও উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খেলে হজমের সমস্যা হতে পারে, ওজন বেড়ে যেতে পারে, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল বাড়তে পারে। তবে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। পরিমাণমতো নিয়ন্ত্রণ জরুরি। সপ্তাহে এক-দুদিন অল্প পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে।

ইফতার শুরু করার জন্য খেজুরের কথা আমরা সবাই জানি। ইসলামী ঐতিহ্যে এটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক যুক্তিও। খেজুরে প্রাকৃতিক চিনি (গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ) থাকে, যা দ্রুত শরীরে শক্তি জোগায়। সারাদিন না খেয়ে থাকার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা কিছুটা কমে যায়। ১–২টি খেজুর সেই ঘাটতি দ্রুত পূরণ করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি এতে আছে আঁশ, পটাশিয়াম ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। আর খেজুরের সঙ্গে এক গ্লাস স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি পান করলে শরীর দ্রুত হাইড্রেটেড হয়। বরফ ঠান্ডা পানি এড়ানো ভালো। কারণ তা হঠাৎ পাকস্থলীতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

আর ইফতারে ছোলা একটি জনপ্রিয় খাবার। সঠিকভাবে রান্না করলে এটি অত্যন্ত পুষ্টিকর। ছোলায় রয়েছে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, আঁশ, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম। প্রোটিন শরীরের কোষ পুনর্গঠনে সাহায্য করে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সহায়তা করে। ছোলা, মুগডাল স্যুপ, সেদ্ধ ডিম বা অল্প তেলে তৈরি চিকেন কাবাব ইফতারের জন্য ভালো প্রোটিনের উৎস হতে পারে।

আর ইফতারের পরপরই অনেকেই ভারি খাবার খেয়ে থাকেন। যেমন ভাত কিংবা পরোটা খেয়ে ফেলেন। এতে শরীরে হঠাৎ অতিরিক্ত ক্যালোরি প্রবেশ করে। এর পরিবর্তে লাল আটা রুটি, ওটস, অল্প পরিমাণ ব্রাউন রাইস খাওয়া যেতে পারে। এগুলো ধীরে হজম হয় এবং দীর্ঘ সময় শক্তি দেয়।

সবকিছু মিলিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ আদর্শ ইফতার প্লেটে থাকতে পারে ২টি খেজুর, এক গ্লাস লেবুপানি কিংবা ডাবের পানি, এক বাটি ফল, অল্প পরিমাণ ছোলা বা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার, একটি হালকা স্যুপ, সীমিত পরিমাণ ভাজাপোড়া। এভাবে খেলে শরীর ধীরে ধীরে শক্তি ফিরে পায় এবং হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *