১১ ফেব্রু ২০২৬, বুধ

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা চালানো কেন এত সহজ না

উদারপন্থী নয়, এমন ব্যবস্থাগুলো পতনের ঠিক আগমুহূর্তে প্রায়ই নিজেদের খুব শক্তিশালী ও স্থায়ী হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের সময় ভিন্ন এক বিভ্রান্তিও তৈরি হতে পারে। মনে হতে পারে, বাইরে থেকে বড় ধরনের কোনো মোক্ষম আঘাতেই বুঝি এ ব্যবস্থার পতন ঘটবে। ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে নজিরবিহীন বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে অনেকের কাছেই এমনটা মনে হতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার একটি জোরালো ধাক্কাই হয়তো দেশটির বর্তমান শাসনের অবসান ঘটাবে।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, অর্থাৎ এমন ধারণা থেকে আসলে ইসলামিক রিপাবলিক বা ইরান রাষ্ট্র ঠিক কীভাবে টিকে আছে, সে সম্পর্কে ভুল বার্তা পাওয়া যায়। ইরানের ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো এর অভ্যন্তরীণ কঠোর সংহতি। দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাপ্রতিষ্ঠানগুলো সমান্তরালভাবে একে অপরের সঙ্গে কাজ করার ক্ষমতা রাখে। এমনকি যখন তাদের শাসনব্যবস্থার বৈধতা সংকটে পড়ে, তখনো এ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংহতি অটুট থাকে। এ অভ্যন্তরীণ শক্তির কারণেই ইরান এমন সব বড় ধাক্কা সামলে নিতে পারে, যা অন্য যেকোনো সাধারণ রাষ্ট্রকে ধসিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

বাস্তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের দোদুল্যমানতা কোনো সুচিন্তিত কৌশলগত অস্পষ্টতা নয়, বরং দর–কষাকষি ও সিদ্ধান্তহীনতার বহিঃপ্রকাশ। এতে ট্রাম্পের চারপাশের প্রতিটি পক্ষই এ বিশ্বাস পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে যে দিন শেষে তাদের যুক্তিই জিতবে।
ইরান শুধু কোনো এক ব্যক্তির নেতৃত্বে পরিচালিত পিরামিডসদৃশ রাষ্ট্র নয়। এটি মূলত একটি নেটওয়ার্কভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। এখানে সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়, রেভোল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি), গোয়েন্দা সংস্থা, ধর্মীয় নেতারা ও একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক বলয়—সবই ক্ষমতার কেন্দ্রে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এমন একটি ব্যবস্থায় কোনো একটি নির্দিষ্ট অংশকে, এমনকি সেটি যদি প্রতীকীভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণও হয়, সরিয়ে দিলেও পুরো কাঠামোর পতন ঘটে না। কারণ, বিকল্প নেতৃত্ব বা চেইন অব কমান্ড এ শাসনব্যবস্থার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবেই তৈরি করা হয়েছে। ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কৌশলগত ‘সাফল্যের’ পর প্রতিপক্ষের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার যে আলোচনা সামনে এসেছে, ইরানের ক্ষেত্রে তা সফল কোনো কৌশল নয়, বরং একধরনের চরম বিশৃঙ্খলার জুয়া বলেই মনে হয়।

এ কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উভয়সংকটটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি একদিকে কট্টর রক্ষণশীলদের চাপে আছেন, যাঁরা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ইরানে সরকার পরিবর্তন চায়। অন্যদিকে রয়েছে তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সমর্থকগোষ্ঠী, যারা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়া বা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো অভিযানে যাওয়ার ঘোর বিরোধী। তাই ট্রাম্পের সহজাত প্রবৃত্তি হলো, এমন এক ঝটিকা আক্রমণ করা, যা দেখতে খুব শক্তিশালী মনে হবে, কিন্তু কোনো দীর্ঘমেয়াদি দায়বদ্ধতা তৈরি করবে না।

আঞ্চলিক রাজনীতি ও ট্রাম্পের সীমাবদ্ধতা

আঞ্চলিক রাজনীতি ট্রাম্পের বিকল্পগুলো আরও সীমিত করে দিচ্ছে। ইসরায়েল চায় তেহরানের বিরুদ্ধে মূল কঠিন কাজটি ওয়াশিংটনই করুক। অন্যদিকে সৌদি আরব, কাতার এবং ওমানের মতো প্রভাবশালী পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো উত্তেজনা প্রশমন ও কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে। সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থনের অভাব যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে দূরপাল্লার হামলার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য করতে পারে। আর এটি দীর্ঘমেয়াদি বিমান হামলা চালানো আরও কঠিন করে তুলবে।

ট্রাম্প তাঁর নিজের বক্তব্যের মারপ্যাঁচেও একধরনের আটকা পড়েছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে ইরান যদি ‘শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে’, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাঁদের ‘উদ্ধারে এগিয়ে আসবে’। এর ফলে একদিকে তাঁকে বিশ্বাসযোগ্য সামরিক বিকল্পের ইঙ্গিত দিতে হচ্ছে, আবার অন্যদিকে তিনি কূটনীতিকেই শ্রেয় বলে মনে করছেন এবং ইঙ্গিত দিচ্ছেন, হত্যাকাণ্ড ‘বন্ধ হচ্ছে’। বাস্তবে এ দোদুল্যমানতা কোনো সুচিন্তিত কৌশলগত অস্পষ্টতা নয়, বরং দর–কষাকষি ও সিদ্ধান্তহীনতার বহিঃপ্রকাশ। এতে ট্রাম্পের চারপাশের প্রতিটি পক্ষই এ বিশ্বাস পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে যে দিন শেষে তাদের যুক্তিই জিতবে।

ইরানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাপ্রতিষ্ঠানগুলো সমান্তরালভাবে একে অপরের সঙ্গে কাজ করার ক্ষমতা রাখে। এমনকি যখন তাদের শাসনব্যবস্থার বৈধতা সংকটে পড়ে, তখনো এ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংহতি অটুট থাকে। এ অভ্যন্তরীণ শক্তির কারণেই ইরান এমন সব বড় ধাক্কা সামলে নিতে পারে, যা অন্য যেকোনো সাধারণ রাষ্ট্রকে ধসিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ মহল প্রকৃতপক্ষে কী চায়, সে বিষয়ে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। তাদের লক্ষ্য, ইরানে উদার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা নয়। তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো, একটি ‘বাস্তববাদী ইরান’ তৈরি করা, যাকে আঞ্চলিক ভূ-অর্থনৈতিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করা যাবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবসার পথ খুলে দেওয়া যাবে এবং চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা থেকে সরিয়ে আনা যাবে। এর অর্থ, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ এবং তথাকথিত ‘প্রতিরোধের অক্ষ’-এর প্রতি ইরানের সমর্থন (তা প্রকৃত হোক বা নামমাত্র) কাটছাঁট করা। এটি মূলত ইরানের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা, দেশটির শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন নয়।

বিমান হামলা শুধু শাস্তি দেওয়ার বা সতর্কবার্তা পাঠানোর মাধ্যম হতে পারে। এটি নির্দিষ্ট কিছু স্থাপনা ধ্বংস করতে ও বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের রাজনৈতিক মূল্য বাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু এমন হামলা চালিয়ে কোনো দেশের নিরাপত্তা খাত পুনর্গঠন, ক্ষমতার উত্তরাধিকার নির্ধারণ কিংবা আচরণের পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়। এমনকি আকাশ থেকে বিক্ষোভকারীদের রক্ষাও করা যায় না। ২০১১ সালের লিবিয়া এ ক্ষেত্রে এক বড় সতর্কবার্তা। সামরিক শক্তি বড়জোর ইরানকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করার একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ চেষ্টা মাত্র, যার ফল উল্টো হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *