মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন যুদ্ধের কালো মেঘে আচ্ছন্ন। দীর্ঘ কয়েক দশকের বৈরিতা ছাপিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখন এক ভয়াবহ সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পারস্য উপসাগরের দিকে শক্তিশালী নৌ-বহর পাঠানোর ঘোষণার পর তেহরানও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, তারা যেকোনো ধরনের যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
ইরানি কর্তৃপক্ষ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যদি তাদের ওপর কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালানো হয়, তবে তার পরিণাম হবে অত্যন্ত ভয়াবহ এবং এর প্রভাব পুরো অঞ্চলের ওপর পড়বে। তেহরানের প্রাণকেন্দ্র ইনকেলাব স্কয়ারে একটি বিশাল বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে একটি বিধ্বস্ত মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর ছবি ও রক্তমাখা মার্কিন পতাকার অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সেখানে ফারসি ও ইংরেজি ভাষায় লেখা হয়েছে যে, যারা বাতাস রোপণ করে তারা ঝোড়ো হাওয়া কুড়াবে। এই প্রতীকি বার্তার মাধ্যমে ইরান বিশ্বকে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে তারা মার্কিন সামরিক শক্তির সামনে মাথা নত করতে রাজি নয়।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যেকোনো উস্কানিমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তারা ব্যাপক এবং অনুশোচনাযোগ্য প্রতিক্রিয়া দেখাবে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন এই সামরিক মহড়া ও হুমকি পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই অস্থিতিশীলতা কেবল ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং তা বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলবে।
বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলোকে সতর্ক করে দিয়ে তেহরান বলেছে, তারা যেন বাইরের কোনো শক্তির উস্কানিতে পড়ে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার মতো কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত না নেয়। ইরান মনে করে, এ ধরনের পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে এবং কূটনৈতিক আলোচনার সব পথ বন্ধ করে দেবে।
এদিকে ইরানের এই কঠোর অবস্থানের পেছনে তাদের মিত্র শক্তিগুলো বা প্রতিরোধের অক্ষের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। ইরাকের কাতায়েব হিজবুল্লাহ ইতিমধ্যেই হুমকি দিয়েছে, ইরানে হামলা হলে তারা মার্কিন ও ইসরায়েলি স্থাপনায় সর্বাত্মক আক্রমণ শুরু করবে। একইভাবে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। হুথির পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে মার্কিন রণতরী ও বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। যা বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছে।
বিদেশের সঙ্গে যখন এই রণহুঙ্কার চলছে, তখন ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও অত্যন্ত নাজুক। গত ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া দেশব্যাপী বিক্ষোভে ইরান এখন টালমাটাল। বিক্ষোভ দমনে দেশটির বিচার বিভাগ ও নিরাপত্তা বাহিনী অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত তিন সপ্তাহ ধরে দেশটিতে ইন্টারনেট পরিষেবা প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও স্থবির হয়ে পড়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, বিদেশি মদতপুষ্ট ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘দাঙ্গাবাজরা’ দেশের সম্পত্তি নষ্ট করছে এবং অস্থিরতা ছড়াচ্ছে। হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি বা হারানা দাবি করেছে, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং ৪১ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যদিও ইরান সরকারের দেওয়া তথ্যানুযায়ী নিহতের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক কম, তবুও তারা স্বীকার করেছে যে কয়েক হাজার মানুষ এই অস্থিরতায় প্রাণ হারিয়েছে।
ইরানের প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসেন মহসেনি-এজেই স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, বিক্ষোভের দায়ে অভিযুক্তদের প্রতি কোনো ধরনের দয়া দেখানো হবে না। তিনি একই সঙ্গে যারা এই সংকটকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছেন, তাদের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, বিশ্বাসঘাতক শত্রুর সাথে সমঝোতা করার কোনো সুযোগ নেই।
অন্যদিকে, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। সরকার ব্যবসায়ীদের জন্য সীমিত আকারে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ দিলেও তার জন্য কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে। সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কড়াকড়ি চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কেবল জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের অনুমতি পেলেই ইন্টারনেট সংযোগ পুনরায় চালু করা হবে, তবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।
সামগ্রিকভাবে, ইরান এখন এক দ্বিমুখী সংকটের মুখোমুখি। একদিকে মার্কিন সামরিক অভিযানের হুমকি ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে দেশের ভেতরে সাধারণ মানুষের ব্যাপক অসন্তোষ ও বিক্ষোভ।
ইরান সরকার বর্তমানে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বাইরের আক্রমণ প্রতিহত করতে তাদের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করছে। তবে এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপ নেবে নাকি কূটনৈতিক কোনো পথে সমাধান আসবে, তা নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে এক বিশাল বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সূত্র: আল জাজিরা

