শোভন চৌধুরী ও অর্নব শারারের দেশে ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর পর এবার শ্যুটিংকে বিদায় জানাচ্ছেন আরেক প্রতিভাবান শ্যুটার শায়রা আরেফিন। এই সময়ের প্রতিশ্রুতিশীল শ্যুটার নতুন দিগন্তের খোঁজে পাড়ি জমাচ্ছেন ইউরোপে। দেশের শ্যুটিং অঙ্গনে তৈরি হচ্ছে বড় শূন্যতা।
কয়েক মাস আগে শায়রা আরেফিনের নাম উচ্চারণ করলেই বাংলাদেশের শ্যুটিং অঙ্গনে যেন এক নতুন আশা ভেসে উঠত। মাত্র ১৮ বছর বয়সে হাংঝু এশিয়ান গেমসে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে ৬২৮ পয়েন্ট অর্জন করে দেশের পক্ষে সর্বোচ্চ স্কোর উপহার দিয়েছেন তিনি। সেই পারফরম্যান্স তাকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অলিম্পিক পরিকল্পনার কেন্দ্রে বসিয়েছিল। কিন্তু আজ, শায়রার নাম ঘিরে শুধু প্রশ্ন, গুঞ্জন ও নীরবতা। জাতীয় শ্যুটিং ক্যাম্পে মাসখানেক ধরে তার অনুপস্থিতি শুধু একজন খেলোয়াড়ের বিষয় নয়; এটি পুরো দেশের শ্যুটিং পরিকল্পনায় বড় ধরনের ছেদ সৃষ্টি করেছে। শায়রাকে ঘিরে শ্যুটিং অঙ্গনে নানা গুঞ্জন ছড়িয়েছে। জানা গেছে, তিনি অসুস্থতার কারণে ছুটি নিয়েছেন; কিন্তু বিষয়টি আরও গভীর। শায়রার বাগদান সম্পন্ন হয়েছে, তিনি জার্মানিতে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি থেকে পাওয়া স্কলারশিপও ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। ফেডারেশন বা শায়রার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য আসেনি। এ নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে, প্রশ্নের সংখ্যা বাড়িয়েছে এবং পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা ভেঙেছে। বাংলাদেশ শ্যুটিং স্পোর্টস ফেডারেশন সূত্রে জানা গেছে, শায়রার অনুপস্থিতি সাময়িক নয়। নির্ধারিত ক্যাম্প, মনিটরিং সেশন এবং আন্তর্জাতিক প্রস্তুতি কার্যক্রমে তার নাম থাকলেও বাস্তবে উপস্থিতি নেই। শ্যুটিং অত্যন্ত সূক্ষ্ম খেলা, যেখানে ধারাবাহিক অনুশীলন, মানসিক দৃঢ়তা এবং ফোকাস অপরিসীম গুরুত্ব রাখে। একজন শ্যুটার নিয়মিত ক্যাম্পে না থাকলে শুধু তার স্কোর নয়, পুরো দলের প্রস্তুতির ধারাবাহিকতাই ভেঙে যায়। এক কর্মকর্তা বলেন, ‘একজন শ্যুটার ক্যাম্পের বাইরে থাকলে শুধু স্কোর নয়, মানসিক প্রস্তুতিও অজানা থেকে যায়।’ শায়রাকে কেন্দ্র করে যে দীর্ঘমেয়াদি অলিম্পিক রোডম্যাপ তৈরি হয়েছিল, সেখানে অন্তর্ভুক্ত ছিল আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ, ধারাবাহিক স্কোর উন্নয়ন, কোয়ালিফিকেশন ট্র্যাকিং এবং স্কলারশিপ। কিন্তু তার অনুপস্থিতি সেই পরিকল্পনাকে পুনর্মূল্যায়নের মুখে ফেলেছে। ফেডারেশনের ভেতরের আলোচনা অনুযায়ী, অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে স্কোয়াডের কম্বিনেশন বদলাতে হবে, বিকল্প শ্যুটার প্রস্তুত করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারে অংশগ্রহণের হিসাব পুনঃনির্ধারণ করতে হবে। এক কোচের মন্তব্য, ‘নিয়মিত অনুশীলন ছাড়া শ্যুটিংয়ের মতো খেলায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন। অনিশ্চয়তা দলের প্রস্তুতিতেও প্রভাব ফেলে।’ তবু, শায়রার প্রতিভা অক্ষত। বয়স এখনো তার পক্ষে এবং আন্তর্জাতিক স্কোর ও মানসিক দৃঢ়তা তাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অংশ করে রাখে। হাংঝু এশিয়ান গেমসে ৬২৮ পয়েন্টের পারফরম্যান্স এবং বাংলাদেশ নারী দলের দলগত রাউন্ডে ১৮৭৬ পয়েন্ট অর্জন তাকে দেশের শ্যুটিং অঙ্গনের সম্ভাবনাময় নাম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে তার পারফরম্যান্সও প্রায় একই স্তরের, যা স্পষ্ট করে, তার দক্ষতা আন্তর্জাতিক মঞ্চেও গুরুত্বপূর্ণ। এক সাবেক শ্যুটারের কথা, ‘অলিম্পিক স্বপ্ন আবেগে নয়, পরিকল্পনায় টিকে থাকে। আর পরিকল্পনা মানেই উপস্থিতি।’ শায়রার অনুপস্থিতি এই তিনটি মূল উপাদানের ঘাটতি তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়ায় সময়ের মূল্য অপরিসীম। যদি শায়রা নিয়মিত ক্যাম্পে না ফেরেন, তবে তার অলিম্পিক স্বপ্ন শুধু দূরে সরে যাবে না, বরং তা অন্য কারও হাতে চলে যেতে পারে। শায়রা কি আবার ক্যাম্পে ফিরবেন? অলিম্পিক প্রস্তুতির ট্র্যাকে থাকবেন? নাকি বাংলাদেশের শ্যুটিং নতুন হিসাব কষবে? এই অধ্যায় এখনো অসম্পূর্ণ। বাংলাদেশের শ্যুটিং অঙ্গন এখন অপেক্ষায়-স্বপ্ন, প্রতিভা এবং বাস্তবতার অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে। শায়রা ফেরেন কি না, সেটাই দেশের শ্যুটিং ভবিষ্যতের বড় প্রশ্ন। কারণ একটি দেশের ক্রীড়া ভবিষ্যৎ শুধু স্কোরে নয়, নিয়মিত উপস্থিতি, ধারাবাহিকতা এবং সুপরিকল্পিত প্রস্তুতিতে গড়ে ওঠে।

