গরুর দুধ বহু শতাব্দী ধরে মানুষের খাদ্যাভ্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ছোটবেলা থেকেই আমরা শুনে থাকি, দুধ পান করলে হাড় মজবুত হয় এবং শরীর সুস্থ থাকে। বাস্তবিক অর্থেও দুধে এমন বহু পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যা শরীরের সঠিক বিকাশ ও কার্যকারিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে সবার জন্য দুধ সমানভাবে উপযোগী নয়; কারও কারও ক্ষেত্রে এটি শারীরিক অস্বস্তির কারণ হতে পারে। তাই দুধের সুফল ও সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতা—দুই দিকই জানা প্রয়োজন।
পুষ্টিমান ও দেহগঠন
গরুর দুধ উচ্চমানের প্রোটিনের একটি ভালো উৎস, যা পেশি তৈরি ও কোষ পুনর্গঠনে সহায়তা করে। শিশু, কিশোর-কিশোরী এবং ক্রীড়াবিদদের জন্য এটি বিশেষভাবে উপকারী। দুধে প্রচুর ক্যালসিয়াম থাকে, যা হাড় ও দাঁত শক্ত রাখে এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে হাড়ক্ষয় বা অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি এতে থাকা ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি১২, ফসফরাস ও পটাশিয়াম স্নায়ুতন্ত্র সক্রিয় রাখা, রক্তকণিকা তৈরিতে সহায়তা করা এবং হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে ভূমিকা রাখে।
হজমজনিত সমস্যা ও ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা
অনেক মানুষের ক্ষেত্রে দুধ সহজে হজম হয় না। এর প্রধান কারণ দুধে থাকা প্রাকৃতিক চিনি ‘ল্যাকটোজ’। যাদের শরীরে ‘ল্যাকটেজ’ এনজাইমের ঘাটতি রয়েছে, তারা ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে ভুগতে পারেন। ফলে দুধ পান করার পর পেট ফাঁপা, গ্যাস বা ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এ ধরনের সমস্যায় ল্যাকটোজমুক্ত দুধ বা বিকল্প হিসেবে দই ও পনিরের মতো গাঁজনজাত দুগ্ধজাত খাবার বেছে নেওয়া ভালো, কারণ এগুলো তুলনামূলকভাবে সহজপাচ্য।
হৃদ্স্বাস্থ্য ও ওজন ব্যবস্থাপনা
একসময় ধারণা ছিল, পূর্ণচর্বিযুক্ত দুধ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিমিত পরিমাণে দুধ অধিকাংশ সুস্থ মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। যাদের কোলেস্টেরল বেশি বা ওজনাধিক্যের সমস্যা আছে, তাদের জন্য স্কিমড বা লো-ফ্যাট দুধ ভালো বিকল্প হতে পারে।
ওজন নিয়ন্ত্রণেও দুধ সহায়ক হতে পারে। এতে থাকা প্রোটিন দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে, ফলে অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের প্রবণতা কমে। তবে অতিরিক্ত চিনি বা কৃত্রিম স্বাদযুক্ত ফ্লেভার্ড মিল্ক এড়িয়ে চলাই বাঞ্ছনীয়।
বয়সভিত্তিক গ্রহণযোগ্যতা
এক বছর বয়সের পর থেকে ধীরে ধীরে শিশুর খাদ্যতালিকায় গরুর দুধ যুক্ত করা যেতে পারে। তবে এক বছরের কম বয়সী শিশুর জন্য মায়ের দুধই সবচেয়ে উপযুক্ত। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রতিদিন এক থেকে দুই গ্লাস দুধ যথেষ্ট, যদি কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা না থাকে।
ত্বক ও চুলের যত্নে ভূমিকা
ত্বক ও চুলের সুস্থতায় দুধের উপকারিতা নিয়ে নানা মত রয়েছে। দুধে থাকা বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ ত্বককে পুষ্টি জোগায়। যদিও সরাসরি দুধ পান করলেই ত্বক উজ্জ্বল হয়—এমন নির্দিষ্ট প্রমাণ সীমিত, তবুও সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে এটি সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়ক।
সব মিলিয়ে, গরুর দুধকে একপাক্ষিকভাবে ভালো বা খারাপ বলা যায় না। ব্যক্তিভেদে দুধের সহনশীলতা ও প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে। যাদের ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা বা অ্যালার্জি নেই, তাদের জন্য পরিমিত দুধ পুষ্টিকর খাদ্য হতে পারে। তবে কোনো সমস্যা থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই শ্রেয়।

