৭ মার্চ ২০২৬, শনি

দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ জ্বালানি তেলের দাম

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তীব্র হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। শুক্রবার (৬ মার্চ) বিশ্ববাজারে ব্যারেলপ্রতি ৯৩ ডলার ছাড়িয়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম; যা সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি। ২০২৩ সালের পর আন্তর্জাতিক বাজারে এটাই অপরিশোধিত তেলের সর্বোচ্চ দাম।
এদিকে কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি সতর্ক করে বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলো আগামী কয়েক দিনের মধ্যে উৎপাদন বন্ধ করে দিতে পারে। এই ঘোষণার পরই বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কাতার এনার্জির প্রধান নির্বাহী সাদ আল-কাবি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে পারে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বাড়ার এই ধারা অব্যাহত থাকলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে পরিবহণ খরচ বৃদ্ধি পাওয়া ছাড়াও হিটিং, খাদ্যপণ্য এবং আমদানিকৃত পণ্যের দাম বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কাতার এনার্জি জানিয়েছে, তাদের এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্রে সামরিক হামলার কারণে তারা উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। সাদ আল-কাবি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে।

কাতারের জ্বালানি মন্ত্রীর মতে, যদি এই যুদ্ধ চলতে থাকে, তবে বিশ্বজুড়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি থমকে যাবে। জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হবে এবং কলকারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দেবে।

বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে। গত সপ্তাহে ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে চীন, ভারত ও জাপানের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলো, যারা অপরিশোধিত তেলের জন্য এই রুটের ওপর নির্ভরশীল, তারা চরম সংকটের মুখে পড়েছে।

রাইস্ট্যাড এনার্জির বিশ্লেষক হোর্হে লিওন এই পরিস্থিতিকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি ‘বাস্তব ঝুঁকি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে বোঝা যাচ্ছে না এটি কি একটি সাময়িক সংকট নাকি এক বিশাল অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের শুরু। যদি সরবরাহ ব্যবস্থা দুই সপ্তাহের বেশি বন্ধ থাকে, তবে বিশ্ব সামষ্টিক অর্থনীতিতে এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে।’

যুক্তরাজ্যের বাজার তদারকি সংস্থা সিএমএ এবং জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফজেম পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ইতোমধ্যে দেশটিতে পেট্রল ও ডিজেলের দাম ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, যদিও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে কয়েক সপ্তাহের তেল মজুত রয়েছে, কিন্তু সেই মজুত ফুরিয়ে গেলে এবং উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজার সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার তাদের জরুরি তেল মজুত বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা করতে পারে, যেমনটি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে করা হয়েছিল।

জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জি আসপেক্টস–এর প্রতিষ্ঠাতা অম্রিতা সেন বলেন, অনেক ব্যবসায়ী শুরুতে মনে করেছিলেন সংঘাত দ্রুত শেষ হবে। এ কারণেই সপ্তাহের শুরুতে তেলের দাম বৃদ্ধির গতি তুলনামূলক কম ছিল।

তিনি আরও বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় তেলের দাম অল্প সময়ের জন্য ১২৮ ডলার পর্যন্ত উঠলেও পরে দ্রুত কমে যায়। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন।

তার ভাষায়, ‘এবার অন্তত প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।’

বাজার বিশ্লেষকদের একাংশ এখন মনে করছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম আবার তিন অঙ্কে স্থায়ীভাবে ফিরে যেতে পারে।

একটি বড় জ্বালানি কোম্পানির এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তেলের দাম তিন অঙ্কে পৌঁছানো ততই নিশ্চিত হয়ে উঠবে। আমার মনে হয়, এটা শুধু সম্ভাবনা নয়—শেষ পর্যন্ত অনিবার্য।’

সূত্র: ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *