১৭ মার্চ ২০২৬, মঙ্গল

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন আজ

আজ ১৭ মার্চ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। ১৯২০ সালের এই দিনে টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া সেই ‘খোকা’ই পরবর্তীতে বাঙালি জাতিকে উপহার দেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, বাংলাদেশ। তাঁর নেতৃত্বে দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পেরিয়ে বাঙালি জাতি নিজের স্বাধীন সত্তা প্রতিষ্ঠা করে। ২০০৪ সালে বিবিসির এক জরিপে তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে নির্বাচিত হন।

পূর্ব বাংলার মানুষের মনে স্বাধীনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলেছিলেন বঙ্গবন্ধু। স্বপ্ন, সাহস, সংগঠন এবং আত্মত্যাগের মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছিলেন মুক্তির আন্দোলন। এই পথ সহজ ছিল না, জেল-জুলুম, নির্যাতন এবং অসংখ্য বাধা তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে কারাগারে। তবুও তিনি কখনো আপস করেননি। মুচলেকার বিনিময়ে মুক্তির প্রস্তাব তিনি বারবার প্রত্যাখ্যান করেছেন, কারণ তাঁর কাছে ব্যক্তিগত মুক্তির চেয়ে জাতির মুক্তি ছিল অনেক বড়।

বঙ্গবন্ধু নিজের জীবন উৎসর্গ করে মানুষের ভালোবাসার ঋণ শোধ করেছেন।
রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার প্রাণনাশের হুমকির মুখে পড়েছেন বঙ্গবন্ধু। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলাকালে বন্দী অবস্থায় তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়। একই ঘটনায় শহীদ হন সার্জেন্ট জহুরুল হক। পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে বাঙালি জনগণ তাঁকে মুক্ত করে এবং ভালোবাসা দিয়ে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করে।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কারাগারে তাঁকে একাকী বন্দী রাখা হয় এবং মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। তবুও তিনি নিজের অবস্থান থেকে একচুলও সরে যাননি।

বঙ্গবন্ধু ধাপে ধাপে বাঙালিকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিয়েছেন। ১৯৬৬ সালে বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের মূল দাবি ছয় দফা ঘোষণা করেন তিনি। এরপর ইয়াহিয়া খানকে নির্বাচন দিতে বাধ্য করেন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। এর প্রতিবাদে ১৯৭১ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন।

৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এই ভাষণ বাঙালির মনে স্বাধীনতার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তিনি ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং শত্রুর বিরুদ্ধে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি কারামুক্ত হয়ে দেশে ফিরে তিনি প্রথমেই যান রেসকোর্স ময়দানে। সেখানে লাখো মানুষের সামনে তিনি তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশের কথা তুলে ধরেন।

তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “ফাঁসির কাষ্ঠে গিয়েও আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলা আমার দেশ, স্বাধীন বাংলা, জয় বাংলা।” তিনি প্রতিশ্রুতি দেন একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়ার। পাশাপাশি স্পষ্ট করে বলেন, ‘এই স্বাধীনতা তখনই পূর্ণতা পাবে— যখন মানুষের খাদ্যের অভাব থাকবে না, যখন মা-বোনেরা সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারবে, যখন যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’

বঙ্গবন্ধুর জীবন ছিল সংগ্রাম, সাহস ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে একজন নেতা নিজের জীবন উৎসর্গ করে একটি জাতিকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিতে পারেন।

আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু ইতিহাসকে স্মরণ করা নয়, বরং তাঁর আদর্শকে ধারণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *