মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নতুন করে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। প্রবাস আয়ের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের জন্য এই সংঘাত রেমিট্যান্স প্রবাহে ধীরগতির আশঙ্কা তৈরি করেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) এক প্রতিবেদনে এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শ্রমবাজারে চাহিদা কমে যেতে পারে। ফলে প্রবাসী কর্মীদের আয় হ্রাস পাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ এ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শ্রমশক্তি মধ্যপ্রাচ্যে নিয়োজিত।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বার্ষিক ৩০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেকটা আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান ও কুয়েতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা এ আয়ের মূল চালিকাশক্তি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো ধরনের অস্থিরতা সরাসরি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এরই মধ্যে সংঘাতের প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার জেরে মধ্যপ্রাচ্যগামী বিপুলসংখ্যক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, যার ফলে নতুন কর্মী পাঠানো এবং পুরনো কর্মীদের যাতায়াতে বিঘ্ন ঘটছে। এতে প্রবাসী শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এডিবির বিশ্লেষণে আরো বলা হয়েছে, সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে ২০২৬-২৭ সময়ে উন্নয়নশীল এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ১.৩ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানির বাজারে অস্থিরতার কারণে মূল্যস্ফীতি ৩ শতাংশের বেশি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেমিট্যান্স শুধু বৈদেশিক মুদ্রার উৎস নয়, এটি দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দিয়ে লাখো পরিবার তাদের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোয় স্থানীয় বাজারে চাহিদা সৃষ্টি হয়। ফলে রেমিট্যান্স কমে গেলে অভ্যন্তরীণ ভোগ ব্যয়ও কমে যেতে পারে।
এদিকে জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কাও নতুন করে চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশ আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন খরচ ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়তে পারে।
তবে এডিবি মনে করছে, এ সংকট সাময়িক হলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে। জ্বালানির বাজার স্থিতিশীল হলে ২০২৭ সালের দিকে মূল্যস্ফীতিও কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি আন্তর্জাতিক ইস্যু নয়, বরং এটি দেশের অর্থনীতির ভেতরে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে রেমিট্যান্স প্রবাহে ধীরগতি দেখা দিলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

