দেশের হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশুর ভিড়। রাজশাহী বিভাগে হামে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। ছয় কারণে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বেড়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, হামের উপসর্গ নিয়ে সারা দেশে ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রাজশাহী এবং বগুড়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়। এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ২ হাজার ২৯৫ জন। এর মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছে ৪২৩ জনের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, সময়মতো রোগ শনাক্ত না হওয়া, স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘট, অর্থায়ন সংকটে সেক্টর কর্মসূচি স্থগিত, ভিটামিন ‘এ’ ও কৃমিনাশক বিতরণ না হওয়া এবং প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থাকা। এসব কারণে সংক্রমণ রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তারা দ্রুত গণ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার এবং আক্রান্ত শিশুদের পৃথক চিকিৎসা ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরে হামের প্রকোপ আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। গত বছর এই সময়ে হাম আক্রান্ত রোগী ছিল ৯ জন। এর আগে ২০২৪ সালের এই সময়ে আক্রান্ত রোগী ছিল ৬৪ জন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এ বছরের প্রথম তিন মাসে রোগী বেড়েছে ৭৫ গুণ। আর ২০২৪ সালের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ১১ গুণ। দেশের আট বিভাগে শনাক্ত হামের রোগীর এমন তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, হঠাৎ করে হামের সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে প্রধান কারণ হতে পারে টিকাদানের ঘাটতি। যেসব শিশুর টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তাদের অনেকে হয়তো তা পায়নি। এখন আমাদের প্রয়োজন হলো, জেলা-উপজেলা হাসপাতালগুলো জনবল ও প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে সজ্জিত করা। দরিদ্র শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারেই কম। তাদের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হওয়া কিংবা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া হামের সাধারণ লক্ষণ। কিন্তু কারও কারও ক্ষেত্রে হাম থেকে নিউমোনিয়াও হতে পারে। শিশুর অপুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে এটি ভয়ানক হতে পারে। নিউমোনিয়া হলে শিশুর অক্সিজেনের প্রয়োজন হতে পারে, আইসিইউতেও নেওয়া লাগতে পারে। অথচ সব জায়গায় আইসিইউ নেই। এসব কারণে এত বেশি শিশু মারা যাচ্ছে। অথচ হামে এত শিশু মারা যাওয়ার কথা নয়। এ পর্যন্ত রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় হামে আক্রান্ত হয়ে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। গতকাল সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সহায়তায় ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা ৩৩টি নমুনার মধ্যে ১৫ জনের মৃত্যুর সঙ্গে হামের সংক্রমণের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এসব মৃত্যুর ঘটনা রাজশাহী অঞ্চলে বেশি হওয়ায় সেখানে বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যেসব শিশু এখনো টিকার আওতায় আসেনি বা নির্ধারিত ডোজ সম্পন্ন করেনি, তাদের মধ্যেই সংক্রমণ ও জটিলতার ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হচ্ছে। তবে টিকা পেয়েও আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবুল হক বলেন, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা টিকা নেওয়ার পর আবারও হামে আক্রান্ত হতে পারে। তাই টিকা নেওয়া থাকলেও আবারও নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। শিশু হাসপাতালে চলতি বছর হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ১৩৮ শিশু। আর বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৩৬ শিশু।

