রমজান মাসে দিনের বেশির ভাগ সময় না খেয়ে থাকতে হয়। তাই এ সময় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা কিছুটা কষ্টকর। কারণ পুরো মাসজুড়ে আলাদা একটি খাদ্যাভ্যাস মেনে চলতে হয়। রমজান মাসে শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন সঠিক খাদ্য ও পুষ্টি।
স্বাভাবিকভাবে ডায়াবেটিস রোগীরা নির্দিষ্ট সময় পরপর বারবার অল্প পরিমাণে খাবার খেয়ে থাকেন। কিন্তু রমজান মাসে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকতে হয়। তাই শারীরিক সুস্থতায় পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
পুরো রমজান জুড়ে ডায়াবেটিস রোগীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। কারণ দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কারণে বেশিরভাগ রোগীর রক্তে গ্লুকোজ কমে গিয়ে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার মত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস রোগীদের গ্লুকোজ বেড়ে গিয়ে হাইপারগ্লাইসেমিয়াও দেখা দিতে পারে। এই সকল ঝুঁকি স্বত্বেও ডায়াবেটিস রোগীরা অবশ্যই রোজা রাখতে পারবেন, তবে কিছু বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
১. রোজার সময় ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে ওষুধের ডোজ সমন্বয় করে নিতে হবে। কারণ অন্য সময়ের তুলনায় এ সময় মুখে খাওয়ার ওষুধ বা ইনসুলিনের ডোজ কিছুটা কমিয়ে আনতে হয়। সকালের ওষুধ ইফতারে আর রাতের ওষুধ সেহেরিতে অর্ধেক ডোজ খেতে বলা হয়, ইনসুলিনের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম।
২. ডায়াবেটিস রোগীদের ইফতারে আঁশযুক্ত খাবার যেমন খেজুর, বিভিন্ন রকম সালাদ এবং ফল অবশ্যই রাখতে হবে। এগুলো রক্তে সুগারের পরিমাণ খুব বেশি বাড়ায় না।
৩. ডায়াবেটিস রোগীরা ইফতারে অতিভোজন বা সেহেরিতে কম খাবেন না। অনেকে এক গ্লাস পানি খেয়েও রোজা রাখেন। ডায়াবেটিস রোগীরা এ কাজ করলে ইফতারের আগেই হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন।
৪. ডায়াবেটিস রোগীরা যত দ্রুত সম্ভব ইফতার করবেন এবং সেহেরি যত দেরিতে সম্ভব খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। ইফতার থেকে সেহেরির মধ্যে প্রচুর পানি পান করতে হবে।
৫. ফলের শরবত খাওয়া যাবে তবে সেখানে কোন চিনি যোগ করা যাবে না। সেহেরিতে ভাত কম খাবেন। শাকসবজি এবং আঁশযুক্ত খাবার বেশি খাবেন। ডাবের পানি পান করতে পারেন নিয়মিত। চা, কফি এড়িয়ে চলুন।
৬. যাদের ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত, তারা রোজা রাখলে হাতের কাছে সবসময় গ্লুকোজ মেশানো পানি, মিষ্টি, খেজুর, ক্যাডবেরি চকলেট রেখে দিন। রক্তে সুপারের মাত্রা অতিরিক্ত কমে এলে এবং শরীর মাত্রাতিরিক্ত দুর্বল লাগলে তাৎক্ষণিক রোজা ভেঙে ফেলুন।
৭. রোজা পালন অবস্থায় কখন কখন রক্তের সুগার পরীক্ষা করবেন, তা নির্ভর করে প্রত্যেক রোগী কী ধরনের ডায়াবেটিসের ওষুধ সেবন করছেন তার ওপর। যেসব রোগী ইনসুলিন বা সালফোনাইল ইউরিয়া গ্রুপের ওষুধ সেবন করছেন তাদের ক্ষেত্রে দিনের একাধিক সময়ে রক্তে সুগার চেক করার প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া রোজা চলাকালে ডায়াবেটিস রোগীর শরীর খারাপ লাগলেও ডায়াবেটিস মেপে দেখতে হবে। এ ছাড়া সেহেরীর আগে, সেহেরী খাওয়ার দুই ঘণ্টা পরে, মধ্য দুপুরে এবং ইফতারের দুই ঘণ্টা আগে মাঝে মাঝে ডায়াবেটিস মেপে নিতে হবে।
৮. প্রত্যেক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিই রক্তে শর্করা কমে বা বেড়ে যাওয়ার লক্ষণগুলো সম্বন্ধে সম্যক ধারণা থাকতে হবে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ডায়াবেটিসে রোগীদের নিম্নলিখিত অবস্থায় রোজা ভাঙতে হবে।
৯. এমন অনেকেই আছেন যারা, ইফতার বেশি খেয়ে পরে রাতের খাবার বাদ দেন। কিন্তু ডায়াবেটিস রোগীর জন্য যেমন ইফতারে অনেক বেশি পরিমাণে ইফতার খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি রাতের খাবার বাদ দেওয়াও তাদের জন্য ক্ষতিকর।
১০. রোজা রাখা অবস্থায় অতিরিক্ত শারীরিক ব্যায়াম না করাই শ্রেয়। বিশেষ করে মধ্য দুপুর থেকে ইফতারের পূর্ব পর্যন্ত। কারণ এতে পানিশূন্যতা অথবা হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। নামাজ পালন করলে আলাদা করে ব্যায়ামের প্রয়োজন নেই। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইফতারের পর নির্দেশিতভাবে হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে।
রমজানে নিরাপদে রোজা নিশ্চিত করার জন্য একটি গঠনমূলক পূর্বপ্রস্তুতি, স্বাস্থ্য সচেতনতা, সার্বজনীন সমন্বয় সাধনমূলক চিকিৎসা পরামর্শের ভূমিকা অপরিসীম। রমজানের আগেই আপনি প্রস্তুতি নিন ও নিরাপদে রোজা পালন করুন।

