লিবিয়ার সেনাপ্রধান মুহাম্মদ আলী আহমেদ আল-হাদ্দাদ মঙ্গলবার তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারার কাছে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হয়েছেন। তাঁর সঙ্গে আরও চার কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছেন। লিবিয়ার আন্তর্জাতিক মহল স্বীকৃত সরকারের প্রধানমন্ত্রী আব্দুল হামিদ দবেইবা এক বিবৃতিতে এ খবর নিশ্চিত করেছেন।
বিমান বিধ্বস্তের ঘটনাকে “বিপর্যয়কর” উল্লেখ করে দবেইবা বলেন, সেনাপ্রধান এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা আঙ্কারায় একটি সফর শেষে দেশে ফিরছিলেন। এ সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে।
দবেইবা বিবৃতিতে বলেন, ‘এই মহাবিপর্যয় দেশ, সেনাবাহিনী এবং জনগণের জন্য এক বিশাল ক্ষতি। কারণ আমরা এমন সব মানুষদের হারিয়েছি যারা আন্তরিকতা ও নিবেদিতভাবে দেশের সেবা করেছেন। শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও জাতীয় অঙ্গীকারের ব্যাপারে তাঁরা উদাহরণ ছিলেন।’
সেনাপ্রধান ছাড়া নিহত অন্যান্য সেনা কর্মকর্তারা হলেন—স্থলবাহিনীর প্রধান আল-ফিতুরি ঘারিবিল, সামরিক বাহিনীর উৎপাদন কর্তৃপক্ষের পরিচালক মাহমুদ আল-কাতাওয়ী, আল-হাদ্দাদের উপদেষ্টা মুহাম্মদ আল-আসাওই দিয়াব এবং সামরিক চিত্রগ্রাহক মুহাম্মদ ওমর আহমেদ মাহজুব।
তুর্কি প্রেসিডেন্টের কমিউনিকেশনস ডিরেক্টরেটের প্রধান বুরহানেত্তিন দূরান জানান, দুর্ঘটনায় তিনজন ক্রু সদস্যও নিহত হয়েছেন। বিমানটি বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে জরুরি অবতরণের জন্য অনুরোধ করেছিল।
দূরান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেন, ‘লিবিয়ার সেনাপ্রধান মুহাম্মদ আল-হাদ্দাদ, তাঁর চারজন সফরসঙ্গী এবং তিনজন ক্রু-কে বহনকারী একটি প্রাইভেট জেট বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের কাছে জরুরি অবতরণের জন্য অনুরোধ করেছিল।
তুরস্কের আইনমন্ত্রী (জাস্টিস) ইলমাজ তুনচ জানান, আঙ্কারার প্রধান প্রসিকিউটর অফিস এই ঘটনায় একটি তদন্ত শুরু করেছে।
তুরস্কের এক কর্মকর্তা আল জাজিরাকে বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী— লিবিয়ার সেনাপ্রধানের বিমান দুর্ঘটনার সঙ্গে কোনো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড জড়িত নেই। প্রাথমিক কারণ প্রযুক্তিগত ত্রুটি।’
তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলী ইয়েরলিকায়া এক্সে জানান, বিমানটি তুরস্কের রাজধানী থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যে সংযোগ হারিয়ে ফেলে।,
ইয়েরলিকায়া আরও জানান, যাত্রীবাহী উড়োজাহাজটি আঙ্কারার এসেনবোগা বিমানবন্দর থেকে ত্রিপোলির উদ্দেশ্যে উড্ডয়ন করেছিল। তুরস্কের আধা-সামরিক বাহিনী “গেন্ডারমারি” জেটটির ধ্বংসাবশেষ হায়মানা জেলার কেসিককাভাক গ্রামের প্রায় ২ কিলোমিটার দক্ষিণ থেকে উদ্ধার করেছে। আঙ্কারা থেকে এর দূরত্ব ৭৪ কিলোমিটার।
এর আগে এক্সে আরেক পোস্টে ইয়েরলিকায়া জানিয়েছিলেন, যাত্রীবাহী ফ্যালকন ৫০ জেট বিমানটি মঙ্গলবার রাত ৮টা ১০ মিনিটে আঙ্কারা থেকে উড্ডয়ন করে। ৮টা ৫২ মিনিট থেকে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে বিমানটির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
আল-হাদ্দাদ দীর্ঘদিন ধরে সেনাবাহিনীতে চাকরি করছেন। পশ্চিম লিবিয়ায় তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়। লিবিয়ার ক্ষমতাচ্যুত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি বিরোধী বিদ্রোহে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
মঙ্গলবারের দুর্ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যার আগের দিন লিবিয়ায় নিজেদের সেনাদের অবস্থানের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তুরস্কের পার্লামেন্ট।
২০১১ সালে গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ২০১৪ সাল থেকে দেশটিতে সমান্তরালে দুটি সরকার আছে। ত্রিপোলিভিত্তিক দবেইবা’র সরকারকে জাতিসংঘ স্বীকৃতি দিয়েছে। এ সরকারের সঙ্গে আঙ্কারার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তারা এ সরকারকে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে।
২০২০ সালে দবেইবা’র সরকারকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিতে সেখানে প্রথমবারের মতো সেনা সদস্য পাঠায় তুরস্ক। পরে দুই দেশের মধ্যে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ নিয়ে একটি চুক্তি হয়। ২০২২ সালে আঙ্কারা ও ত্রিপোলি জ্বালানি অনুসন্ধান নিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। আল-হাদ্দাদের এই সফরে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতে “দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা” নিয়ে বৈঠক হয়েছে।

