২৭ ফেব্রু ২০২৬, শুক্র

শনি গ্রহের মহারহস্যের সমাধানের দাবি বিজ্ঞানীদের

শনি গ্রহের অবস্থান সূর্য থেকে বেশ দূরে। বরফ–গ্যাসে মোড়া বিশালাকার গ্রহ শনি। একে ঘিরে ঘুরছে অসংখ্য উপগ্রহ। শনির বলয় মহাকাশ বিজ্ঞানীদের কাছে সব সময়ই আগ্রহের বিষয়। বহুদিন ধরে বিজ্ঞানীরা ভাবছেন, এই বলয় এল কোথা থেকে? আর কেন গ্রহটি নিজের কক্ষপথের তুলনায় প্রায় ২৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি কাত হয়ে ঘোরে? সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, এর উত্তর লুকিয়ে আছে শনির সবচেয়ে বড় উপগ্রহ টাইটানের ইতিহাসে।

টাইটান উপগ্রহটি সৌরজগতের আরেক বিস্ময়। আকারে এটি বুধ গ্রহের চেয়ে বড়, পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক। ঘন কমলা রঙের কুয়াশায় ঢাকা টাইটানের আকাশ। টাইটান পৃষ্ঠে আছে মিথেনের হ্রদ। এই মিথের ভর এত বেশি যে এর মহাকর্ষ বল শনিকে সামান্য দুলিয়ে দেয়। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, টাইটান প্রতিবছর প্রায় ১১ সেন্টিমিটার করে শনি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আগের ধারণার চেয়ে অনেক দ্রুত এই সরে যাওয়ার গতি। কোটি কোটি বছর পর হয়তো শনির কক্ষপথ ছেড়ে চলেও যেতে পারে টাইটান।

২০০৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ক্যাসিনি মহাকাশযান শনিকে ঘিরে ঘুরে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। এই তথ্য বিশ্লেষণ করে শনি গ্রহ নিয়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা। যেমন কেন শনির ঘূর্ণন ও নেপচুনের কক্ষপথের দুলুনির মধ্যে প্রত্যাশিত মিল নেই? আগে ধারণা ছিল, দূরের গ্রহ নেপচুনের মহাকর্ষীয় প্রভাবেই শনির কাত হওয়া ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু ক্যাসিনির তথ্য বলছে, হিসাব মিলছে না। কোথাও একটি ‘হারানো অংশ’ আছে।
২০২২ সালে কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানী প্রস্তাব করেছিলেন, এক হারানো উপগ্রহ, যার নাম দেওয়া হয় ক্রিসালিস। যেটি একসময় শনির চারপাশে ঘুরত। পরে খুব কাছে চলে এসে এই উপগ্রহ ভেঙে পড়ে। যার ধ্বংসাবশেষ থেকেই গড়ে ওঠে শনির বলয়। তবে নতুন গবেষণায় ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন ভিউ এসইটিআই ইনস্টিটিউটের সিনিয়র গবেষণা বিজ্ঞানী মাতিজা চুক ও তাঁর সহকর্মীরা বলছেন, গল্পটা আরও নাটকীয়। তাঁদের মতে, প্রায় অর্ধবিলিয়ন বছর আগে টাইটানের সঙ্গে আরেকটি বড় উপগ্রহ প্রোটো হাইপেরিয়নের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। সেটি ছিল বর্তমান শনির উপগ্রহ হাইপেরিয়নের চেয়ে প্রায় হাজার গুণ বড়। সংঘর্ষে সেটির অধিকাংশ ভর টাইটানের সঙ্গে মিশে যায়। এর কিছু অংশ থেকে জন্ম নেয় আজকের অদ্ভুত বেঁকে যাওয়া উপগ্রহ হাইপেরিয়ন।

এই সংঘর্ষ সম্ভবত শনির দোলন ও কাত হওয়া ব্যাখ্যা করতে পারে। উপগ্রহটির অতিরিক্ত ভরের কারণে শনির ঘূর্ণন নেপচুনের সঙ্গে মিলেছিল। কিন্তু সংঘর্ষ ও বিলুপ্তির পর সেই তাল কেটে যায়। তাই এখন এই দুই গ্রহের সামান্য অমিল দেখা যায়। টাইটানের ধীরে ধীরে দূরে সরে যাওয়া কক্ষপথ অভ্যন্তরীণ শনির ছোট উপগ্রহগুলোকে অস্থির করে তোলে। এরা একে অন্যের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে যে ধ্বংসাবশেষ তৈরি করে, তারই কিছু অংশ থেকে হয়তো গড়ে ওঠে শনির ঝলমলে বলয়। সম্ভবত মাত্র ১০ কোটি বছর আগে।
টাইটানের পৃষ্ঠ তুলনামূলকভাবে কম বয়সী। মাত্র ৩০ কোটি বছর বয়স। এই ইঙ্গিত সংঘর্ষ-তত্ত্বকে সমর্থন করে। যদি সত্যিই বড় আঘাতে টাইটানের পৃষ্ঠ নতুনভাবে গড়ে ওঠে, তবে কমসংখ্যক গর্ত থাকা স্বাভাবিক।

এই রহস্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা হতে পারে ড্রাগনফ্লাই মিশনে। আকারে গাড়ির মতো, পারমাণবিক শক্তিচালিত এই উড়ন্ত রোবট ২০২৮ সালে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনায় আছে। ২০৩৪ সালের দিকে টাইটানে পৌঁছে বিভিন্ন স্থানে নেমে নমুনা সংগ্রহ করবে। টাইটানের রাসায়নিক গঠন, ভূতত্ত্ব আর বয়স সম্পর্কে সরাসরি তথ্য পেলে বোঝা যাবে, সত্যিই কি এক প্রাচীন মহাজাগতিক সংঘর্ষ বদলে দিয়েছিল পুরো শনিগ্রহ পরিবারকে?

সূত্র: সিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *