১১ ফেব্রু ২০২৬, বুধ

সূর্য থেকে নির্গত শক্তিশালী সৌর বিকিরণ পৃথিবীতে আঘাত হেনেছে। গত সোমবার এই সৌর কার্যকলাপের প্রভাবে আকাশে রঙিন অরোরা (রঙিন আলোর খেলা) দেখা যায়। উড়োজাহাজ চলাচলে ব্যবহৃত জিপিএস ব্যবস্থায় সাময়িক সমস্যাও দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের স্পেস ওয়েদার প্রেডিকশন সেন্টার (এসডব্লিউপিসি)।

সংস্থাটি জানায়, তীব্রতার মাত্রায় এই সৌর বিকিরণ ঝড় পাঁচের মধ্যে চার নম্বরে অবস্থান করছে। একে গত ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সৌরঝড় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সৌর বিকিরণ ঝড় বলতে সূর্য থেকে বিপুল পরিমাণ দ্রুতগতির চার্জযুক্ত কণার পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসাকে বোঝায়। এর ফলে মহাকাশযান উৎক্ষেপণ, বিমান চলাচল এবং স্যাটেলাইট পরিচালনায় প্রভাব পড়তে পারে। সর্বশেষ এমন ভয়াবহ সৌর বিকিরণ ঝড় দেখা গিয়েছিল ২০০৩ সালের অক্টোবরে। সেই বছর ‘হ্যালোউইন স্পেস ওয়েদার স্টর্ম’-এর সময় সুইডেনে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমার ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানিয়েছে এসডব্লিউপিসি।

পৃথিবীতে সৌরঝড় পৌঁছালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে অবস্থানরত মহাকাশচারীদের জন্য বাড়তি বিকিরণ ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে মেরু অঞ্চলের ওপর দিয়ে উড্ডয়নকারী উড়োজাহাজের যাত্রীদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বাড়ে। এই ঝড়ের আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট সব গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে সতর্ক করে দেয় এসডব্লিউপিসি। সংস্থাটির পূর্বাভাসকারী শন ডাল বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অবকাঠামো পরিচালনাকারীদের আমরা আগেভাগেই জানিয়ে দিয়েছি, যাতে তারা পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রস্তুত থাকতে পারেন।’

বিকিরণের ঝুঁকি বাড়লে মহাকাশচারীরা মহাকাশ স্টেশনের অপেক্ষাকৃত সুরক্ষিত অংশে আশ্রয় নেন। যেমনটি তারা এর আগেও করেছেন, বিশেষ করে ২০২৪ সালের মে মাসে সংঘটিত একটি চরম ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের সময়। এই ধরনের ঝড় স্যাটেলাইট যোগাযোগ ও নেভিগেশন ব্যবস্থার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি ফর অ্যাটমোসফেরিক অ্যান্ড স্পেস ফিজিক্সের সৌর পদার্থবিদ রায়ান ফ্রেঞ্চ জানান, গত সোমবার রাতে সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা ছিল না। এ ছাড়া সোমবার দুপুর ২টা ২০ মিনিটে (ইস্টার্ন টাইম) পৃথিবীতে একটি তীব্র ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় আঘাত হানে বলে জানান শন ডাল।

ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের মূল কারণ করোনাল মাস ইজেকশন (সিএমই)। অর্থাৎ, সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল থেকে প্লাজমা ও চৌম্বক ক্ষেত্রের বিশাল বিস্ফোরণ। এসব বিস্ফোরণ পৃথিবীর দিকে ধেয়ে এলে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়। রোববার সূর্য থেকে নির্গত এই সিএমইটি একটি এক্স-ক্লাস সৌর শিখা থেকে উৎপন্ন হয়, যা সৌর শিখার সবচেয়ে শক্তিশালী ধরন। চলতি বছরে এটিই প্রথম বড় সৌর শিখা ছিল বলে জানান ফ্রেঞ্চ।

সৌর কার্যকলাপ বাড়লে মেরু অঞ্চলে অরোরা বা মেরুজ্যোতি দেখা যায়। উত্তর গোলার্ধে দেখা যায় ‘অরোরা বোরিয়ালিস’ এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ‘অরোরা অস্ট্রালিস’। সূর্য থেকে আসা শক্তিশালী কণাগুলো পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে সংঘর্ষের পর বায়ুমণ্ডলের গ্যাসের সঙ্গে বিক্রিয়া করে এই রঙিন আলো সৃষ্টি করে। অরোরার কার্যকলাপ সাধারণত ২০ মিনিটের ছোট ছোট বিস্ফোরণের মাধ্যমে তীব্র হয়।

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলের বড় অংশে এমনকি আলাবামা ও উত্তর ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত অরোরা দেখা যেতে পারে। তবে সিএমএইর চৌম্বক ক্ষেত্রের দিকনির্দেশের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক অরোরা দেখা যায়নি। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অত্যন্ত উজ্জ্বল ও বর্ণিল অরোরা দেখা গেছে।

সূত্র: সিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *