৫ মে ২০২৬, মঙ্গল

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়, হেরে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস। সে নির্বাচনে পরিবর্তনের ঢেউয়ে পরাজিত হয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ও সিপিআইএম প্রার্থী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। যাদবপুর আসনে তাকে হারান রাজ্যের সাবেক মুখ্য সচিব মণীশ গুপ্ত। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের শাসনামলে মণীশ গুপ্ত ছিলেন রাজ্যের শীর্ষস্থানীয় আমলা। পরবর্তী সময়ে তাকেই প্রার্থী করে তৃণমূল। সাবেক এক আমলার কাছে মুখ্যমন্ত্রীর ওই পরাজয় সে সময় রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন তোলে। এরপরই মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। প্রায় দেড় দশক পর ফের ঘটল সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি।

পদে থাকা অবস্থায় পরাজিত হলেন আরেক মুখ্যমন্ত্রী। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুর আসনে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার বিরুদ্ধে বিজেপির প্রার্থী ছিলেন তার একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী শুভেন্দু অধিকারী। ২০ রাউন্ড ভোট গণনা শেষে শেষ হাসি হাসেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি মমতাকে পরাজিত করেন ১৫ হাজার ১০৫ ভোটের ব্যবধানে। মমতার প্রাপ্ত ভোট ৫৮ হাজার ৮১২ এবং শুভেন্দুর প্রাপ্ত ভোট ৭৩ হাজার ৯১৭।

রাজ্যজুড়ে গেরুয়া ঝড়ের মুখে পড়ে দিশেহারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বেসামাল হয়ে পড়ে তার দল তৃণমূল কংগ্রেস। যদিও শুভেন্দু অধিকারীর কাছে মমতার পরাজয় এই প্রথম নয়। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর কাছে দেড় হাজার ভোটে হেরে গিয়েছিলেন তিনি। যদিও সে নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফেরে তৃণমূল। এরপর ভবানীপুর আসনে উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা।

১৯৫১ সালে ভবানীপুর বিধানসভা আসন গঠিত হলেও ১৯৬২ সালে এর নাম পরিবর্তন হয়ে হয় কালীঘাট। একসময় আসনটির অস্তিত্ব লুপ্ত ছিল। ২০০৯ সালে পুনরায় ভবানীপুর গঠিত হওয়ার পর সেখানে দীর্ঘদিন তৃণমূলের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল।

২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা ঘোষণার আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছিলেন, ভবানীপুর থেকেই তিনি প্রার্থী হবেন এবং এক ভোটে হলেও জিতবেন। কিন্তু বাস্তবে তার ঘটল ঠিক উল্টো।

বাঙালি হিন্দু, অবাঙালি ও মুসলিম ভোটারের মিশ্রণে ভবানীপুরকে অনেকেই ‘মিনি ইন্ডিয়া’ বলে থাকেন। সোমবার সকাল ৮টায় পোস্টাল ব্যালট গণনার মাধ্যমে শুরু হয় ভোট গণনা। শুরুতে এগিয়ে ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। সপ্তম রাউন্ডে ব্যবধান ঘুচিয়ে এগিয়ে যান মমতা। এক পর্যায়ে তিনি প্রায় ১৯ হাজার ভোটে এগিয়েছিলেন। তখন অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন জয় প্রায় নিশ্চিত। তবে ১৫ রাউন্ড শেষে ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৯০০ ভোটে। ১৬ রাউন্ড শেষে শুভেন্দু ৫৫৪ ভোটে এগিয়ে যান। এরপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি তাকে। ধীরে ধীরে ব্যবধান বাড়িয়ে জয় নিশ্চিত করেন বিজেপি প্রার্থী।

এদিকে ফল ঘোষণার পর রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্ত অশান্তি ও সহিংসতার খবর পাওয়া যায়। পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুরের মুচিপাড়ায় তৃণমূল কার্যালয়ে ভাঙচুর হয়েছে। এর প্রতিবাদে তৃণমূল কর্মীরা সার্ভিস রোড অবরোধ করেন। পরে কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আসানসোল বাসস্ট্যান্ড ও গোধূলি মোড়ে তৃণমূলের দুটি কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।

মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে বিজেপির বিজয় মিছিল চলাকালে ভাকুড়ি ১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান বিপ্লব কুন্ডুর বাড়িতে ভাঙচুর ও বাইকে আগুন দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

রায়গঞ্জের কলেজপাড়ায় ইটাহারের জয়ী তৃণমূল প্রার্থী মোশারফ হোসেনের গাড়িতে হামলার অভিযোগ ওঠে। মালদার গাজোলের চাকনগরে তৃণমূল নেতা ত্রিনাথ বিশ্বাসের বাড়ি ও দোকানে ভাঙচুর চালানো হয় বলে অভিযোগ। নন্দীগ্রামে তৃণমূল কার্যালয় ভাঙচুর, ব্যানার-ফেস্টুন ছেঁড়া এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কুশপুতুল ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ ওঠে বিজেপির বিরুদ্ধে। একই ধরনের ভাঙচুর হয় মধ্য হাওড়ার ডুমুরজলার তৃণমূল কার্যালয়েও।

দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরে তৃণমূল নেতা পরেশ বসাকের মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানোর অভিযোগ উঠেছে বিজেপির বিরুদ্ধে। তাকে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

অন্যদিকে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিংয়ে বিজেপির বিজয় মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বিজেপি কর্মী অর্ঘ্যদীপ বোস। তার ডান পায়ে গুলি লাগে। এছাড়া ক্যানিং পশ্চিম বিধানসভার গোলকপাড়ায় ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়ায় তিন বিজেপি কর্মীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। যদিও তৃণমূল সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। রাজ্যজুড়ে এখনো থমথমে পরিস্থিতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *