প্রযুক্তির প্রসার, লেনদেনে স্বচ্ছতা এবং নগদ টাকা বহনের ঝুঁকি এড়াতে ক্রমেই ডিজিটাল লেনদেনের দিকে ঝুঁকছে মানুষ। ঘরে বসে যখন সব সুবিধা মোবাইলের মাধ্যমেই পাওয়া যায়, তখন ব্যাংকে লাইন ধরার চিন্তা কেউ করবে না এটাই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যও একই কথা বলছে। কারণ কার্ড, এমএফএস ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং মিলে এখন মাসে মোট লেনদেন হয় চার লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনলাইন লেনদেন যত বাড়বে, আর্থিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসনও ততই বাড়বে। পাশাপাশি নগদ টাকা বহনের ঝুঁকি কমবে। বাঁচবে প্রতিবছর টাকা ছাপানোর পেছনে খরচ হওয়া সরকারের অর্থ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, এপ্রিল ২০২৬-এ কার্ডভিত্তিক লেনদেন (ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রি-পেইড কার্ড মিলিয়ে) মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৯৯.৫৪ বিলিয়ন টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৪৯ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে একই সময়ে মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেসের (এমএফএস) মাধ্যমে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল দুই লাখ এক হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। দেশের ৫৮টি তফসিলি ব্যাংক এখন ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের সেবা দিচ্ছে।
এই অনলাইন ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫৮৯.১৭ বিলিয়ন, অর্থাৎ এক লাখ ৫৮ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এপ্রিলে চার লাখ ১০ হাজার ২০৮ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে কার্ড, ইন্টারনেট ও মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, নগদ টাকার ব্যবহার ক্রমেই কমে আসছে। কারণ এখন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা প্রতি মাসে ৯০ শতাংশের বেশি কেনাকাটা করেন ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। আর যেসব চাকরিজিবী বা ব্যবসায়ীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে, তাঁরা ৩০ শতাংশের বেশি কেনাকাটা ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে করে থাকেন।
এর জন্য কেউ মোবাইল ব্যাংকিং, কেউ ইন্টারনেট ব্যাংকিং আবার কেউ কার্ড ব্যবহার করেন। বাংলা কিউআর পুরোপুরি চালু হলে এই লেনদেন আরো বাড়বে। ক্যাশনির্ভরতা কমবে। এতে প্রতিবছর ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ বাঁচবে সরকারের। দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে এবং তাৎক্ষণিক আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) বা মোবাইল আর্থিক সেবা।
শুধু অর্থ পাঠানোই নয়, অনেক নতুন সেবাও মিলছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও কেনাকাটার বিল পরিশোধ, বেতন-ভাতা বিতরণ, বিদেশ থেকে টাকা পাঠানোসহ (রেমিট্যান্স) বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছে। সে কারণেই দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে মাধ্যমটি। বর্তমানে ১৪টি এমএফএস প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল সেবা দিচ্ছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৯টি পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) প্রতিষ্ঠান ই-ওয়ালেট ও ডিজিটাল পেমেন্ট সেবা দিচ্ছে।
এগুলো হচ্ছে, আইপে সিস্টেমস লিমিটেড, ডি মানি বাংলাদেশ লিমিটেড, রিকারশন ফিনটেক লিমিটেড, গ্রিন অ্যান্ড রেড টেকনোলজিস লিমিটেড, প্রগতি সিস্টেমস লিমিটেড, এবিজি টেকনোলজিস লিমিটেড, ডিজিটাল পেমেন্টস লিমিটেড, সেবা ফিনটেক লিমিটেড এবং সমাধান সার্ভিসেস লিমিটেড।
এই পিএসপি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তারা ই-ওয়ালেট, অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে ও বিভিন্ন ডিজিটাল লেনদেন সেবা প্রদান করে নগদবিহীন লেনদেন সহজ ও জনপ্রিয় করে তুলছে। এর ফলে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের জন্য দ্রুত, নিরাপদ ও সহজ লেনদেনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে দেশের অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘আমরা ডিজিটাল লেনদেনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ সব লেনদেন ডিজিটাল হয়ে গেলে স্বচ্ছতা বাড়বে। অনিয়ম-দুর্নীতি কমে আসবে। একই সঙ্গে নগদ টাকা ছাপানোর পেছনে সরকারের খরচও কমবে। প্রতিনিয়ত রাস্তায় টাকা ছিনতাইয়ের খবর পাওয়া যায়। যদি বেশি টাকা বহন করার ভয় থাকে, তাহলে ব্যাংকে রেখে চলাচল করলে কেউ আর সেই টাকা ছিনতাই করতে পারবে না। আবার চাইলেই অনলাইনের মাধ্যমে সে টাকা দিয়ে কেনাকাটাও করতে পারবে। আবার চাইলেই সে ব্যাংক থেকে টাকা তুলতেও পারবে। এই কাজগুলো সামনে এগিয়ে নিতে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।’

