17 Jul 2026, Fri

সয়াবিন তেলের পরিবর্তে শর্ষের তেল খাওয়া কি নিরাপদ

বাড়িতে আজ কোন তেলে রান্না হচ্ছে? উত্তরে অধিকাংশ মানুষই বলবেন সয়াবিন। সূর্যমুখী, ক্যানোলা বা রাইস ব্র্যান স্বাস্থ্যকর হলেও বেশ দামি। এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল বেশ স্বাস্থ্যকর, তবে এটিও দামি। তা ছাড়া সব তেল উচ্চ তাপে রান্নার উপযোগী নয়। কোনো কোনো বাড়িতে হয়তো শর্ষের তেলে রান্না হচ্ছে। শর্ষের তেলে রান্না করা কোনো পদ, এমনকি ‘সাদামাটা’ আলুভর্তাও খাবার টেবিলের পরিবেশে ভিন্নতা আনতে পারে। শর্ষের তেলে বিকেলের মুড়িমাখাও হয়ে ওঠে বিশেষ কিছু।
রসনাবিলাসে নিঃসন্দেহে শর্ষের তেল অতুলনীয়। তবে এর স্বাস্থ্যগত দিক নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে। এ বিষয়ে জানালেন ধানমন্ডির পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. সাইফ হোসেন খান।
সয়াবিন তেলের চেয়ে এগিয়ে
শর্ষের তেলে স্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিডের মাত্রা সয়াবিন তেলের চেয়ে অনেকটাই কম। আবার শর্ষের তেলে মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিডের মাত্রা বেশি। তবে পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিডের মাত্রা আবার তুলনামূলক কম। অর্থাৎ ওমেগা–৩ ও ওমেগা–৬ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ কম।
ওমেগা–৩ ও ওমেগা–৬ ফ্যাটি অ্যাসিড দেহের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় উপাদান। সয়াবিন তেলে ওমেগা–৬ ফ্যাটি অ্যাসিড অনেকটা বেশি থাকে। তবে ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড যে সয়াবিন তেলেও খুব বেশি থাকে, তা কিন্তু নয়। ফ্যাটি অ্যাসিডের আনুপাতিক এই হিসাব অনুযায়ী, শর্ষের তেল হৃৎপিণ্ডের জন্য উপকারী। এই তেল রক্তের খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাজে দেয়। এতে ওমেগা–৬ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ কম হলেও আধুনিক জীবনধারায় নানান খাবার থেকেই ওমেগা–৬ ফ্যাটি অ্যাসিড পেয়ে যাই আমরা। তাই পুষ্টি উপাদান বিবেচনায় শর্ষের তেল ভালো।
যা নিয়ে বিতর্ক
শর্ষের তেল নিয়ে বিতর্কের অন্যতম একটি বিষয় হলো এতে থাকা ইরুসিক অ্যাসিড। গবেষণা বলছে, প্রাণীর শরীরে এর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, এই ইরুসিক অ্যাসিডের কারণে হৃৎপিণ্ডের কোষে চর্বি জমতে পারে। তবে মানবদেহে এ ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কোনো শক্ত প্রমাণ নেই।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) রান্নায় শর্ষের তেল ব্যবহারের অনুমতি দেয় না। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ২৭টি দেশে ইরুসিক অ্যাসিডের সর্বোচ্চ নিরাপদ (সহনীয়) মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এদিকে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের অনেক পরিবারই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শর্ষের তেলে রান্না করে আসছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্যগত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ব্যাপক প্রমাণ দেখা যায়নি।

শেষ কথা
বুঝতেই পারছেন, শর্ষের তেল নিরাপদ, নাকি ক্ষতিকর—এই বিতর্কের সমাধান আজও দিতে পারেনি বিজ্ঞান। তাই এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য–উপাত্তের ভিত্তিতে আপনার জন্য নিরাপদ সিদ্ধান্ত হতে পারে মাঝেমধ্যে শর্ষের তেলের স্বাদ নেওয়া। অবশ্যই তা পরিমিত। সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে শিশুদের রোজ শর্ষের তেলে রান্না করা খাবার না দেওয়াই ভালো।
তবে সুস্থ থাকতে বাঙালিয়ানার এই অতুলনীয় স্বাদ থেকে কাউকে পুরোপুরি বঞ্চিত রাখা জরুরি নয়। তবে শর্ষের তেল খাঁটি হওয়া চাই। ভেজাল তেলে নানাবিধ স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। স্বাস্থ্যকর ও নির্ভেজাল হলেও রোজকার গ্রহণ করা মোট তেলের (যে তেলই হোক) পরিমাণ চার থেকে পাঁচ টেবিল চামচের বেশি হওয়া উচিত নয়।
আর এ বিষয়গুলো অবশ্যই খেয়াল রাখবেন—
যাঁদের পরিপাকতন্ত্র বেশ সংবেদনশীল, তাঁদের জন্য ঝাঁজালো এই তেল অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

হৃদ্‌রোগ, লিভারের রোগ ও দীর্ঘমেয়াদি কিডনির রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি বা গর্ভবতী নারীর রোজকার খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করতে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

শর্ষের তেলে অ্যালার্জি থাকলে গ্রহণ করবেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *