29 Jul 2026, Wed

মুন্সীগঞ্জে পাটচাষে ফিরছে প্রাণ, সোনালি আঁশে সুদিনের আভাস

একসময় মুন্সীগঞ্জের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল পাট। জেলার বিস্তীর্ণ দুই ফসলি জমিতে আলু তোলার পরই শুরু হতো সোনালি আঁশের চাষ। সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট, পাট জাগ দেওয়ার পানির অভাব, ন্যায্যমূল্য নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতিবছরই কমছে পাটের আবাদ। তবে চলতি মৌসুমে বাজারে পাটের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে আবারও আশার সঞ্চার হয়েছে।

জেলার সদর, টঙ্গীবাড়ী, শ্রীনগর, সিরাজদিখান, লৌহজং ও গজারিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়  দেখা গেছে, আগের তুলনায় অনেক কম জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। কোথাও কৃষক পাট কাটছেন, কোথাও জাগ দিচ্ছেন, আবার কোথাও আঁশ ছাড়িয়ে শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। জেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে, ছোট ছোট সেতু ও কালভার্টের রেলিংজুড়ে শুকাতে দেওয়া হয়েছে সোনালি আঁশ। পাট প্রক্রিয়াজাতকরণের পুরো কাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সমানভাবে অংশ নিচ্ছেন।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও পাট চাষে ভালো লাভ হতো। কিন্তু বর্তমানে সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ এবং শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি পাট জাগ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় খাল-বিল ও জলাশয়ও দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে অনেক কৃষক পাট ছেড়ে ভুট্টা, সবজি ও অন্যান্য লাভজনক ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।

সদর উপজেলার আধারা গ্রামের কৃষক সিদ্দিকুর রহমান জানান, এ বছর তিনি প্রায় ৯০ শতাংশ জমিতে দেশি জাতের পাট চাষ করেছেন। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ পাট প্রায় ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম ভালো হলেও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত লাভ মিলছে না।

একই গ্রামের কৃষক লালন মিয়া বলেন, গত বছর লোকসানের কারণে পাট চাষই করেননি। এবার বাজারে ভালো দাম পাওয়ার আশায় আবার পাটের আবাদ করেছেন। তবে তিনি মনে করেন, পাটচাষিদের জন্য সরকারি সহায়তা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে যে সহযোগিতা পাওয়া যায়, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত।

কৃষক মজিবর হোসেন বলেন, ‘এখন পাট চাষ করতে অনেক টাকা লাগে। শ্রমিক পাওয়া কঠিন, আবার জাগ দেওয়ার জন্য দূরের খাল-বিল কিংবা জলাশয়ে যেতে হয়। এতে পরিবহন ও শ্রম ব্যয় আরও বেড়ে যায়। তবে এবার বাজারদাম ভালো থাকায় কৃষকদের মধ্যে কিছুটা উৎসাহ ফিরে এসেছে।’

কৃষকদের অভিযোগ, মৌসুমের শুরুতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় নির্ধারিত সময়ে পাট জাগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে দূরের খাল-বিল ও জলাশয়ে নিয়ে পাট জাগ দিতে হয়েছে। এতে সময়ের পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থও ব্যয় হয়েছে। খাল-বিল ভরাট ও জলাশয় কমে যাওয়ায় প্রতিবছরই এ সংকট আরও প্রকট হচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৩১৩ হেক্টর। কিন্তু বাজারমূল্য ভালো থাকায় লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ৩ হাজার ৩৬৪ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জ সদরে ৫৬১ হেক্টর, টঙ্গীবাড়ীতে ৭৭৪, শ্রীনগরে ২৩০, সিরাজদিখানে ১ হাজার ১২৭, লৌহজংয়ে ৫২০ এবং গজারিয়ায় ১৫২ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। চলতি মৌসুমে জেলায় ৩৪ হাজার ৩০৫ বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, “বাজারে পাটের ভালো দাম থাকায় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। উন্নত জাতের ‘জেআরও-৫২৪’ পাট চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এই জাতের পাটে শাখা-প্রশাখা কম থাকায় আঁশের মান ভালো হয় এবং আঁশ ছাড়ানোর সময় ক্ষতির আশঙ্কাও কম থাকে।” তিনি জানান, কৃষকদের উৎসাহিত করতে জেলায় ৬০০ জন পাটচাষীকে প্রণোদনা হিসেবে ১ কেজি করে বীজ এবং ৫ কেজি করে এমওপি ও ডিএপি সার দেওয়া হয়েছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক তন্তুর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাট ও পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে কৃষকদের সহজ শর্তে কৃষিঋণ, উন্নত বীজ, উৎপাদন উপকরণে ভর্তুকি, পর্যাপ্ত জাগ দেওয়ার ব্যবস্থা, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। তাহলে শুধু পাট চাষই নয়, দেশের ঐতিহ্যবাহী সোনালি আঁশও ফিরে পাবে তার হারানো গৌরব; একই সঙ্গে কৃষকের আয় বৃদ্ধি ও রপ্তানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এ শিল্প।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *