১১ ফেব্রু ২০২৬, বুধ

দেশে সোনার দাম পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটছে। চলতি মাসে এখন পর্যন্ত দামি এ ধাতুর দাম ভরিতে ২৭ হাজার টাকার মতো বেড়েছে। ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম গতকাল বৃহস্পতিবার বেড়ে প্রায় ২ লাখ ৫২ হাজার টাকায় ওঠে। রাতে অবশ্য ভরিতে দাম ৩ হাজার ১৪৯ টাকা কমানোর ঘোষণা এসেছে। তাতে আজ শুক্রবার থেকে প্রতি ভরি সোনা ২ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৮ টাকায় বিক্রি হবে।

খরচ আরও আছে। এক ভরি ওজনের সোনার অলংকার বানাতে ৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৬ শতাংশ মজুরি দিতে হয়। ফলে প্রতি ভরিতে মোট খরচ দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা।

বিশ্বে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম হু হু করে বাড়ছে। তার প্রভাবে দেশেও দাম বাড়িয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)। বৈধ পথে আমদানি না হওয়ার অজুহাতে সব সময়ই বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় দেশে সোনার দাম বেশি থাকে।
এদিকে সোনার দাম ক্রমাগত বাড়ায় বুলিয়ন মার্কেটের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সোনা ধরে রাখার প্রবণতা বেড়েছে। তাতে পাকা সোনার সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। সার্বিকভাবে জুয়েলারি পণ্য বেচাবিক্রিতে ধস নেমেছে।

জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা বলেন, সোনার দাম অনেক আগেই সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। তারপরও ছোটখাটো কিছু ক্রয়াদেশ পেত ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের জুয়েলারি। এখন সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। তাতে জুয়েলারি ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় আছেন তাঁরা।

জানতে চাইলে বাজুসের সাবেক পরিচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, সোনার বাজারে অস্থিরতা চলছে। সরকার ৫ শতাংশ ভ্যাট কমালে এবং ব্যাগেজ রুলসে সোনা আনায় কড়াকড়ি শিথিল করলে বাজারে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরবে।

দাম বেড়েছে ১,৬৩৯ গুণ

দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সোনার ভরি ছিল ১৭০ টাকা। পরের সাড়ে পাঁচ দশকে সোনার দাম বেড়েছে ১ হাজার ৬৩৯ গুণ। এখন ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দর ২ লাখ ৫২ হাজার ৪৬৭ টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

বাজুসের তথ্যানুযায়ী, ২০০০ সালে ২২ ক্যারেটের সোনার ভরি ছিল ৬ হাজার ৯০০ টাকা। পরের পাঁচ বছরে সেটি বেড়ে দ্বিগুণ হয়। ২০১০ সালে সোনার দাম তিন গুণ বেড়ে হয় ৪২ হাজার ১৬৫ টাকা। ২০১৫ সাল পর্যন্ত দাম খুব একটা না বাড়লেও তার পরের ৫ বছরে ভরিতে ২৬ হাজার ৮৫২ টাকা বেড়ে যায়।

করোনার পর গত পাঁচ বছরই সোনার দাম দ্রুতগতিতে বেড়েছে। ২০২৩ সালের ২১ জুলাই সোনার ভরি এক লাখ টাকায় ওঠে। তা গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেড় লাখ ও অক্টোবরে ২ লাখ টাকার মাইলফলক স্পর্শ করে। গতকাল আড়াই লাখ টাকা অতিক্রম করে, যদিও পরে খানিক নিচে নামে।

দেশে দাম অনেক বেশি

বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় দেশে সোনার দাম বেশি। সোনার দাম যত বাড়ছে, সেই ব্যবধানও বাড়ছে। দুবাই জুয়েলারি গ্রুপের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাইয়ে গতকাল ২২ ক্যারেটের সোনার ভরি ছিল ৬ হাজার ২৮৪ দিরহাম, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ লাখ ৯ হাজার ৭৬৫ টাকা। ভারতের বুলিয়ন অ্যান্ড জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের ওয়েবসাইটে দেখা গেছে, দেশটিতে গতকাল একই মানের সোনার ভরি ছিল ১ লাখ ৭৩ হাজার ৪৬৩ রুপি, যা বাংলাদেশের ২ লাখ ৩০ হাজার ৫৭৩ টাকার মতো।

বাংলাদেশের সোনার বাজার খুবই ছোট। ধারণা করা হয়, দেশে বছরে ২০ থেকে ৪০ টন সোনার চাহিদা রয়েছে। তার মধ্যে ১০ শতাংশ চাহিদা পূরণ হয় পুরোনো অলংকার দিয়ে। বাকিটা ব্যাগেজ রুলের আওতায় ও অবৈধ পথে বিদেশ থেকে আসা সোনা দিয়ে পূরণ হয়।

যাত্রী (অপর্যটক) ব্যাগেজ (আমদানি) বিধিমালা অনুযায়ী, একজন যাত্রী বছরে বিদেশ থেকে আসার সময় ভরিপ্রতি ৫ হাজার টাকা শুল্ক দিয়ে ১০ ভরির মতো (১১৭ গ্রাম) সোনার বার আনতে পারেন।

বাজুসের সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আমিনুল ইসলাম  বলেন, ‘বৈশ্বিক বাজারে শিগগিরই প্রতি আউন্স সোনার দাম পাঁচ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সেটি হলে দেশে দাম আরও বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারের দামে ব্যবসায়ীদের কাছে সোনা বিক্রির ব্যবস্থা করে, তাহলে কিছুটা হলেও রিলিফ পাবেন সাধারণ ভোক্তারা।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *