৮ এপ্রি ২০২৬, বুধ

জন্মের পর বেশ কয়েক মাস ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু দৃশ্যটা পালটাতে শুরু করল মেয়ের বয়স দু’বছর পেরোনোর পর। শিশুটি যা একটু-আধটু শব্দ করত, তাও বন্ধ হয়ে গেল। ডাকলে সাড়া দেয় না, শব্দ করে না। দৃষ্টি দেয় না, চোখ যেন ঘোলাটে। হাতে কোনো কিছু দিলে সেটা নিয়েই বসে থাকে। মেয়ে কি তাহলে বাকপ্রতিবন্ধী? অথচ মোবাইল ফোন দিলে তো দিব্যি চুপ করে শোনে, দেখেও। আদর করলে মায়ের কোলে চুপটি করে ঘুমিয়ে পড়ে। তা হলে সমস্যাটা কোথায়? মেয়েকে নিয়ে রাজধানীর কমলাপুরের ফাতেমা বিনতে উর্ম্মি শেষ পর্যন্ত ছুটলেন হাসপাতালে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জানালেন, ‘ওর তো অটিজম আছে’। সেই থেকেই ওই শিশুর প্রতি পুরো পরিবারের সদস্যরা অবহেলা করতে শুরু করে। মেয়ের মাকে তালাক দিয়ে অন্যত্র বিয়ে করলেন বাবা। শত হতাশা আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও মেয়ে-শিশুকে আগলে রেখেছেন জন্মদাত্রী মা।

রাজধানীর মিরপুরে একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করছেন জিনাত আরা মুন্নি। জানালেন, অটিস্টিক শিশুর মা হওয়ার কারণে তার সংসার ভেঙে গেছে। অটিস্টিক ছেলেকে তিনি প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন। অটিজম নিয়ে এ রকম গল্প শুধু উর্ম্মি ও মুন্নির বেলায় নয়, অসংখ্য পরিবারে অটিজম আক্রান্ত শিশু রয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে নিবন্ধিত অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তির সংখ্যা ৮৩ হাজার ৩৫০ জন। এছাড়া ১৬-৩০ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে অটিজম শনাক্তের হার প্রতি ১০ হাজারে ১৭ জন। আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৭৯ শতাংশই ছেলে। হংকংয়ের ‘জার্নাল অফ ডেন্টিস্ট্রি’তে প্রকাশিত গবেষণার দাবি-‘মাইক্রোবায়োম বায়োমার্কার’ পদ্ধতিতে অটিজম ৮১ শতাংশ নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব। কিন্তু সমাজের কিছু ভ্রান্ত ধারণা, অটিস্টিক শিশু কোনো দিনও সুস্থ হবে না। এর কোনো ওষুধ নেই, তারা বড় হলে কী করবে, কে দেখবে ওদের? এমন অবস্থায় প্রতি বছরের মতো আজ ২ এপ্রিল ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’ পালিত হচ্ছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য-‘অটিজম কোনো সীমাবদ্ধতা নয়, প্রতিটি জীবন মূল্যবান’। প্রতি বছরই ক্যালেন্ডার ধরে দিনটি আসে, চলেও যায়। দুনিয়াজুড়ে ফের বাৎসরিক একবার অটিজম সচেতনতা নিয়ে নানা আঙ্গিকে আলোচনা হয়। তারপর যেমন চলার, চলে তেমনই।

১৯৪৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ লিও ক্যানার প্রথম মনস্তাত্ত্বিক সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে রোগটি শনাক্ত করে ‘অটিজম’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের ২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাংলাদেশেও প্রতিবছর ২ এপ্রিল দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এদিকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. অমিতাভ চক্রবর্ত্তীর স্বাক্ষরিত এক পত্রে জানা যায়, এবার ২ এপ্রিল উদ্যাপন না করে আগামী ২০ এপ্রিল দিবসটি সরকারিভাবে পালিত হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অটিজম রোগ নয়, এটি এক ধরনের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধকতা। অটিজম আক্রান্ত শিশুরা প্রতিভা নিয়েই জন্মায়, অথবা সঠিক পরিচর্যা ও সহযোগিতা পেলে প্রতিভাবান হয়ে উঠতে পারে।

এদিকে অটিজম নিয়ে সচেতনতা বাড়লেও একইসঙ্গে এর সংখ্যা বাড়ছে। এর চিকিৎসা ও মোকাবিলায় অন্তরায় হিসাবে রয়েছে চরম অবহেলা ও হতাশা। এমনও পরিবার রয়েছে, অটিজম আক্রান্ত শিশুকে আড়ালে রাখছে। কেউ আবার ওইসব শিশুকে সৃষ্টিকর্তার বিশেষ শিশু হিসাবে মেনে নিচ্ছেন। পরিবারে ওই অটিজম শিশুটিকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। তবে, অধিকাংশ পরিবারেই অটিস্টিক শিশুরা অবহেলার শিকার, বিশেষ করে যেসব পরিবারে প্রধান সমস্যা আর্থিক দুরবস্থা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, অটিজম রোগ নয়। যথাযথ চিকিৎসা ও সচেতনতার মাধ্যমে এটি ভালোও হয়। সমাজে কিছু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে-অটিজম হলেই ওই শিশু আর সুস্থ হবে না-এটা ভুল। বরং সমাজকে সচেতন হতে হবে। অটিজম প্রতিরোধে সামাজিকভাবেও ওইসব পরিবার ও শিশুদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। সরকারিভাবে ওইসব শিশুর পুরো চিকিৎসার খরচ নিশ্চিত করা জরুরি। অটিস্টিক শিশুদের সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পদ হিসাবে গড়ে তুলতে সমাজ ও রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হবে। সব স্কুলে অটিস্টিক শিশুদের ভর্তির সুযোগ রাখার তাগিদ দিয়েছেন সাবেক উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অটিজম সচেতনতায় এক আলোচনা সভায় তিনি বলেছিলেন, দেশের প্রতিটি স্কুলেই এদের পড়াশোনার স্থান করে দিতে হবে। স্কুলের ভেতরে এ শিশুদের বিশেষ কক্ষ রাখা জরুরি। এদিকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অটিজম-সংক্রান্ত ইনস্টিটিউটে চিকিৎসার পাশাপাশি রয়েছে অটিজম স্কুল। এখানে প্রতিদিনই গড়ে একশ থেকে দেড়শ রোগী আসে আউটডোরে চিকিৎসা নিতে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবুল কালাম বলেন, দেশের প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অটিজম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় আলাদা ইউনিট জরুরি। কারণ, এসব শিশুর বাবা-মা কিংবা অভিভাবক মারা গেলে তারা একেবারেই অসহায় হয়ে পড়ে। যথাযথ চিকিৎসা পেলে এসব শিশুর প্রায় ৮০ শতাংশ সুস্থ হয়ে ওঠে। এসব শিশুর বেড়ে উঠার পুরো দায়িত্ব সরকারের নেওয়া উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *