মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহ চেইনে অনিশ্চয়তা ও দামের ওঠানামা মোকাবিলায় দেশের সব ধরনের মার্কেট ও শপিংমল সন্ধ্যা ৬টার পর বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে খাবারের দোকান, ওষুধের দোকানসহ প্রয়োজনীয় সেবা এ সিদ্ধান্তের বাইরে থাকবে।
সরকারি ও বেসরকারি সব অফিসের সময় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে সরকার। ব্যাংকিং কার্যক্রম চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত। আর বিকাল ৪টায় ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিষয়ে রোববার শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রাত ১২টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারে মন্ত্রিসভা বৈঠক-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে দেশের সরবরাহ ব্যবস্থা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দামের ওঠানামা সামাল দিতে সরকার কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নিয়ে কাজ করছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী তিন মাস সরকারি ব্যয় কমানো হবে। এ সময়ে সরকারের নতুন কোনো যানবাহন কেনা হবে না। জলযান, আকাশযান ও কম্পিউটার সামগ্রী কেনাও বন্ধ থাকবে। অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে। সরকারি অর্থায়নে সব বৈদেশিক প্রশিক্ষণ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। সভা-সেমিনারের ব্যয়ও ৫০ শতাংশ কমানো হবে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে সরকারি ব্যয় ৩০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ ব্যয়ও ৩০ শতাংশ কমাতে বলা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আগামী তিন মাস সরকারি ব্যয় কমানো হবে। এ সময়ে কোনো নতুন যানবাহন, জলযান, আকাশযান ও কম্পিউটার সামগ্রী কেনা হবে না। সরকারি অর্থায়নে সব বৈদেশিক প্রশিক্ষণ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে রাত সাড়ে ৮টার দিকে মন্ত্রিপরিষদ বৈঠক শুরু হয়ে শেষ হয় রাত সাড়ে ১১টার পর। দেশের জ্বালানি সংকট নিয়ে করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পরে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় রোববার থেকে আলাদা নির্দেশনা দিতে শুরু করবে বলেও জানানো হয়েছে। সব শ্রেণি ও সব প্রতিষ্ঠানের জন্য এক ধরনের সিদ্ধান্ত না নিয়ে আলোচনা করে ধাপে ধাপে নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়। এক প্রশ্নের জবাবে নাসিমুল গণি বলেন, রোববার থেকেই কিছু নির্দেশনা দেওয়া শুরু হবে।
আরেক প্রশ্নে তিনি বলেন, সব শ্রেণি ও সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একই ধরনের ব্যবস্থা হবে না। এ কারণে আলোচনা করে ধাপে ধাপে নির্দেশনা দেওয়া হবে, যাতে শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত না হয়।
বিয়ে বা উৎসব উপলক্ষ্যে আলোকসজ্জা নিয়েও কড়াকড়ির কথা জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, বিয়ে বা উৎসব উপলক্ষ্যে কোনো ধরনের আলোকসজ্জা করা যাবে না। মার্কেট সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত কীভাবে কার্যকর হবে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নজরদারির ব্যবস্থা থাকবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এ বিষয়ে কাজ করবে। তিনি বলেন, এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মনিটরিং ব্যবস্থা থাকবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান ব্যবস্থার মাধ্যমেই তা তদারক করা হবে।
জ্বালানি সাশ্রয়ের এই পদক্ষেপ কতদিন চলবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। পরিস্থিতি ও সরকারের সক্ষমতা বিবেচনায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে বলে জানানো হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, পরিস্থিতি কত দূর যায়, সেটি দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। যুদ্ধের কারণে সেখানে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আনার উদ্যোগ চলছে। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে সরবরাহ শুরু হয়েছে। কাজাখস্তান থেকেও জ্বালানি আনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সরকারি স্কুলে শিক্ষার্থীদের পরিবহণে ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে বৈদ্যুতিক বাস ব্যবহারে উৎসাহ দিতে নতুন সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে। যেসব স্কুল এ উদ্যোগে অংশ নেবে, তারা শুল্ক ছাড়াই বাস আমদানি করতে পারবে। বাণিজ্যিক খাতে যারা বৈদ্যুতিক বাস আনবে, তাদের ২০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। তবে পুরোনো বাস আনা যাবে না, আনতে হবে একেবারে নতুন বাস।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সরকারি স্কুলগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে ইলেকট্রিক বাস ব্যবহারে উৎসাহ দিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যেসব স্কুল এ কার্যক্রমে অংশ নেবে, তারা শুল্কমুক্তভাবে বাস আনতে পারবে। বাণিজ্যিক খাতে এ সুবিধা থাকলেও সেখানে ২০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। পুরোনো বাস নয়, কেবল নতুন বাস আনা যাবে। সরকারের দপ্তরগুলোতেও কাজের চাপ বেড়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। নাসিমুল গণি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে কাজের সময় অনেক বেড়ে গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার সাধারণ মানুষের ওপর চাপ যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে চায়। একই সঙ্গে অবৈধ মজুত ও কৃত্রিম সংকট তৈরির বিষয়টিও সরকারের নজরে রয়েছে। সরকার চেষ্টা করছে, যেন সাধারণ মানুষের ওপর চাপ যতটা সম্ভব কম পড়ে। অবৈধ মজুত ও কৃত্রিম সংকট তৈরির বিষয়টি সরকারের নজরে আছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে।
রাত ৮টার মধ্যে সব দোকান বন্ধ, ঘোষণা দোকান মালিক সমিতির : এদিকে, এর আগে দেশের সব দোকানপাট, বাণিজ্যবিতান ও শপিংমল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ দোকান মালিক ব্যবসায়ী সমিতি। জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দোকান মালিকরা। বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ দোকান মালিক ব্যবসায়ী সমিতি। সংগঠনের সভাপতি নাজমুল হাসান মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়।
এতে বলা হয়, বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি ও ঢাকা মহানগর দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির স্ট্যান্ডিং কমিটির যৌথ সভায় জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের সব দোকান, বাণিজ্যবিতান এবং শপিংমল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় এ সরকারকে সহযোগিতার লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। তবে হোটেল, ফার্মেসি এবং জরুরি প্রয়োজনীয় সেবার দোকান, কাঁচাবাজারের আওতাবহির্ভূত থাকবে বলেও জানানো হয়।

