দেশে দেড় মাস ধরে হামের প্রাদুর্ভাব চলছে। বিষয়টি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে। সংস্থাটির মতে অত্যন্ত সংক্রামিত মিজেলস ভাইরাসবাহী রোগটি ইতোমধ্যে ৯১ শতাংশ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে প্রায় অর্ধেক রোগীই ঢাকা বিভাগে। হামে শিশুদের ব্যাপক হারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গ নিয়ে (সন্দেহভাজন রোগী) ৬ এবং নিশ্চিত হামে ৩ জনসহ মোট ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। যার অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ৫ জনই ঢাকা বিভাগের। এছাড়া ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহভাজন ১২৭৬ রোগীর মধ্যে সবেচেয়ে বেশি ৬১৫ জন ঢাকা বিভাগের। ২৪ ঘণ্টায় ১৬৩ জনের নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি ৯০৬ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৭৬ জন ঢাকা বিভাগের। আর সবচেয়ে কম ৫ জন ভর্তি হয়েছে রংপুরে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলেন, হাম রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে অল্প বয়সি শিশুরা। বেশির ভাগ হামের রোগী তীব্র জ্বর, শরীরে র্যাশ ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক শিশুর ডায়রিয়া, নাক দিয়ে পানি ঝরা, কানে পূঁজ, চোখ লাল হওয়া, চোখ খুলতে পারে না। মুখের ভেতর ঘা হওয়ায় খেতে পারে না। কিছুক্ষেত্রে আক্রান্ত শিশুর এনকেফালাইটিস (মস্তিষ্কে প্রদাহ) হতে পারে। এছাড়া হামের রোগীর নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট হলে আইসিইউ’র প্রয়োজনে তাদের জেনারেল আইসিইউতে রাখা যায় না। আলাদা আইসিইউ প্রয়োজন হয়। বেশি প্রয়োজন হয় অক্সিজেন। জেলা পর্যায়ের বেশির ভাগ হাসপাতালে হামের শিশুদের জন্য পৃথক আইসিইউ নেই। উপজেলা পর্যায়ের সেন্ট্রাল অক্সিজেন নেই। ফলে পরিস্থিতি গুরুতর হলেই হাম আক্রান্ত শিশুর অভিভাবকরা জেলা-উপজেলা থেকে রোগীদের ঢাকায় নিয়ে আসছেন।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (শিশুস্বাস্থ্য) ডা. এআরএম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হামে মারা যাওয়া বেশির ভাগ রোগীই শেষ মুহূর্তে জটিল পরিস্থিতি নিয়ে আসছে। অনেকে পেরিফেরিতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে বেশি খারাপ হচ্ছে। অনেক হাসপাতালে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী ও লজিস্টিক সাপোর্ট যেমন : আইসিইউ, পিআইসিইউ, এনআইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সংকট রয়েছে। ফলে সন্তানের হাম উপসর্গ দেখা দিলেই অভিভাবকরা ঝুঁকি না নিয়ে ঢাকার হাসপাতালে আসছেন। ঢাকার টারশিয়ারি লেভেলের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে।
হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ডা. শ্রীবাস পাল বলেন, হামের চিকিৎসা হয় উপসর্গভিত্তিক। শিশুর হাম আক্রান্তের শুরুতে অনেক অভিভাবক বিষয়টি বুঝতে পারেন না। দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে রেফার্ড হয়ে আসা রোগীদের প্রায় ১০ শতাংশই অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে গিয়ে হাম সংক্রামিত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া হাম সংক্রমণের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ৩৪,৬৬২ জন, এর মধ্যে ঢাকা বিভাগেই শনাক্ত ১৫,৬৪৩ জন। এ সময়ে হাম নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৩,৩৪৮ জন, যার মধ্যে ঢাকা বিভাগে ১০,২৫৩ জন।
এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৪,৮৫৬ জন, যার মধ্যে ঢাকা বিভাগের রোগী ৩,৩১১ জন। আর হাম উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ২২৬ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১০৫ জন ঢাকা বিভাগের। নিশ্চিত হামে মারা যাওয়া ৪৭ জনের মধ্যে ঢাকা বিভাগের ৩১ জন।
ঢাকার পর হাম উপসর্গযুক্ত সন্দেভাজন বেশি রোগী ৬,৪৬৪ জন পাওয়া গেছে রাজশাহীতে। এই বিভাগে মারা গেছেন ৭০ জন। আর ভর্তি হয়েছে ৩,৪৫১ জন। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে হাম উপসর্গযুক্ত সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৪৬৬১ জন, মারা গেছে ২০ এবং ভর্তি হয়েছে ৩৯৪২ জন।
খুলনা বিভাগে হাম উপসর্গযুক্ত সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ২৬০৩ জন, ভর্তি হয়েছে ২২১০ জন, মারা গেছে ১২ জন। বরিশাল বিভাগে হাম উপসর্গযুক্ত সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ২৩৩১ জন, ভর্তি হয়েছে ১৬৮৪ জন, মারা গেছে ৮ জন। সিলেট বিভাগে হাম উপসর্গযুক্ত সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ১৪৫৫ জন, ভর্তি হয়েছে ১১১৫ জন, মারা গেছে ১১ জন। রংপুর বিভাগে হাম উপসর্গযুক্ত সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৮৭৬ জন, ভর্তি হয়েছে ৩০৯ জন। ময়মনসিংহ বিভাগে হাম উপসর্গযুক্ত সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৬৫৩ জন, ভর্তি হয়েছে ৩৮৪ জন। তবে রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে কারও মৃত্যুর তথ্য দেয়নি স্বাস্থ্য বিভাগ। এদিকে দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) হালনাগাদ তথ্য বলছে, ইতোমধ্যে দেশের ৬১টি জেলায় হাম ছড়িয়েছে।
এদিকে ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত ৮ বিভাগে ৯৪ লাখ ২৩ হাজার ৭৯৯ শিশু টিকা পেয়েছে। এছাড়া দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনে ১৩ লাখ ৩১ হাজার ৩১৯ শিশু টিকা পেয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক পরামর্শক ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ঢাকা বিভাগে বস্তি, শিল্পকারখানা বেশি হওয়ায় দরিদ্র মানুষের বসবাস ও ঘনবসতি বেশি। ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোর মানুষও চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ছুটে আসেন। উপজেলা-জেলায় ভোগান্তির কথা ভেবেও বর্তমান হাম পরিস্থিতিতে অনেকেই ঢাকায় আসছে। জ্বর বা হামের প্রাথমিক পর্যায়েই কিমউিনিটি ক্লিনিক থেকে শুরু করে উপজেলা-জেলা সেকেন্ডারি পর্যায়ের হাসপাতালে চিকিৎসা নিশ্চিত করলে ঢাকায় রোগীর চাপ কমবে। এজন্য চিকিৎসাব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ ও কার্যকর টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে।
হামে শিশুমৃত্যুতে আসকের উদ্বেগ : এদিকে চলমান হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। সংস্থাটি মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে হামের টিকাদানের ক্ষেত্রে অতীতের অবহেলা, গাফিলতি বা সিদ্ধান্তহীনতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রতিদিনই নতুন করে বিপুলসংখ্যক শিশু হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হচ্ছে, হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। দুঃখজনকভাবে প্রাণ হারাচ্ছে। একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে এভাবে শিশুমৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, নীতি পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির গুরুতর ব্যর্থতার প্রতিফলন।
আসকের বিবৃতিতে কয়েকটি দাবি জানানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে-অবিলম্বে দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ; ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল, বস্তি, পাহাড় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার; আক্রান্ত শিশুদের বিনামূল্যে ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত; টিকা সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা দূর এবং অতীতের অবহেলা, গাফিলতি বা সিদ্ধান্তহীনতার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা।

