18 Jul 2026, Sat

খাগড়াছড়িতে বন্যায় ক্ষতি ৬৬ কোটি টাকা

বন্যায় খাগড়াছড়িতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে। জেলায় কৃষি ও মৎস্যসহ বিভিন্ন খাতে ৬৬ কোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ১৪ হাজার ৮৪৮টি। বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানে কৃষিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলার ৩৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ২৮ ইউনিয়নের কৃষকের দুই হাজার ৩০০ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাঙামাটিতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে এক হাজার ১৩৮ হেক্টর কৃষিজমি। শুক্রবার তৃতীয় দিনের মতো জোয়ারে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার নিম্নাঞ্চল পানির নিচে রয়েছে। মেঘনার পানি বিপৎসীমার উপর প্রবাহিত হওয়ায় দ্বিতীয় দিনের মতো ভোলার মনপুরায় নিম্নাঞ্চল ৫-৬ ফুট জোয়ারে প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া নোয়াখালীর হাতিয়ার নিঝুমদ্বীপে জোয়ারের পানিতে ভেসে আসা অজ্ঞাত ব্যক্তির অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

খাগড়াছড়ি বন্যায় ক্ষতি ৬৬ কোটি টাকা

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় ২৭৫টি বসতবাড়ি সম্পূর্ণভাবে এবং ৭৬৫টি বসতবাড়ি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ১৪ হাজার ১৭৪ জন উপকারভোগীর কাছে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। কৃষি খাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এক হাজার ৩১ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে প্রায় ১১ কোটি ২০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া মৎস্য খাতে ৪৫০টি পুকুর ও ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আর্থিক ক্ষতি প্রায় ২ কোটি ২৫১ লাখ টাকা। এছাড়া প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৭ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন ২১ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার সড়ক, ৫টি সেতু এবং ৪টি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ খাতে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ২৮ কোটি ৫ লাখ টাকা।

সম্প্রতি খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউজে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের উপস্থিতিতে জেলায় বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য তুলে ধরেন খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত। অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, অবকাঠামো মেরামত বা সংস্কারে উদ্যোগ গ্রহণ করবে সরকার। দ্রুত সময়ের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক করার জন্য আমরা চেষ্টা করব।

বান্দরবানে বিধ্বস্ত কৃষি

বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে জেলার ৩৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ২৮ ইউনিয়নের কৃষকের দুই হাজার ৩০০ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, আট হাজারের বেশি কৃষকের শুধু কৃষিপণ্যের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১০ কোটি টাকারও বেশি। স্থানীয় কৃষক ছাত্তার, সুমন দাস ও মংথোয়াই বলেন, এনজিও থেকে ঋণ নিয়েই জমিতে ফসলের চাষ করেছি। বন্যায় খেতের ফসল সব নষ্ট হয়ে গেছে। এখন কি খাব এবং ঋণের কিস্তি দেব কীভাবে সেই দুশ্চিন্তায় আছি।

এদিকে বান্দরবানের সাঙ্গু ও মাতামুহুরি নদীর তীরজুড়ে গড়ে ওঠা বিস্তীর্ণ মৌসুমি চাষাবাদও ভেসে গেছে। জেলার সাতটি উপজেলায় ফসলের মাঠজুড়ে কৃষির ক্ষতচিহ্ন দেখা গেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবু নাঈম সাইফুদ্দিন বলেন, জেলায় কৃষি খাত বিধ্বস্ত হয়েছে। বছরের একমাত্র আয়ের উৎস হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে কৃষকদের। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন এবং কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করে কৃষকদের চাষযোগ্য বীজ দেওয়া হচ্ছে।

রাঙামাটিতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় ক্ষতিগ্রস্তরা

বন্যায় রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার শুধু ফারুয়া ইউনিয়নের এক ৪৮৬ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া উপজেলা সদরসহ অন্য এলাকাতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। শুক্রবার জেলায় সরেজমিন দেখা যায়, ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। তারা পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিজ উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামত করছেন। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িঘর মেরামত ও গাছপালা, ময়লা-আবর্জনার স্তূপ অপসারণসহ স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফেরার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাকির হোসেন জানান, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির তালিকা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি মেরামতের জন্য দ্রুত ঢেউ টিন ও নগদ অর্থ মঞ্জুর করার চেষ্টা হবে। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এবারের বন্যা ও পাহাড় ধসে জেলায় মোট ১ লাখ ৮ হাজার ৭১৭ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সরকারি ত্রাণের সুবিধা পেয়েছেন ৩২ হাজার ৫৪৬ জন। ৭৬ হাজার ৭১৭ জন মানুষ এখনো সরকারি কোনো সুবিধার আওতায় আসেননি। জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, ভবিষ্যতে দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে ও ক্ষতিগ্রস্তদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনে আমরা সমন্বিত মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছি।

লোহাগাড়ায় কৃষিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার কৃষি খাতে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে এসেছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে উপজেলার এক হাজার ১৩৮ হেক্টর কৃষিজমি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় নয় হাজার ৫০০ জন কৃষক। প্রাথমিকভাবে কৃষি খাতে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ কোটি ৫২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা।

লোহাগাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাজী শফিউল ইসলাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ বিতরণ করা হবে।

তৃতীয় দিনের মতো পানির নিচে রাঙ্গাবালীর নিম্নাঞ্চল

টানা তৃতীয় দিনের মতো জোয়ারে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে জোয়ারে উপজেলার চালিতাবুনিয়া ও চরমোন্তাজ ইউনিয়নের ভাঙা চরআন্ডা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও আঙিনা তলিয়ে যায়। অনেক পরিবারের পুকুরের মাছ ভেসে গেছে এবং রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ভেঙে থাকা বেড়িবাঁধের কারণে অস্বাভাবিক জোয়ার হলেই লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে। প্রতিবছরই একই ধরনের দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে তাদের। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কলাপাড়া নির্বাহী প্রকৌশলী শাহ আলম বলেন, নতুন প্রকল্পের সমীক্ষা ও যাচাই-বাছাই চলছে। ডিপিপি অনুমোদিত হলে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ।

মনপুরায় এখনো পানিবন্দি স্থানীয়রা

মনপুরায় মেঘনা নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার উপর প্রবাহিত হওয়ায় নিম্নাঞ্চল ৫-৬ ফুট জোয়ারে প্লাবিত হয়েছে। কলাতলী ইউনিয়নের বেশির ভাগ এলাকা জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। শুক্রবার জোয়ারের পানিতে ডুবে যায় আবাসন প্রকল্পের ষাট কলোনির ঘরবাড়ি। দুদিন ধরে সেখানকার লোকজন এ অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। সরেজমিন দেখা গেছে, মনপুরা ইউনিয়নের ষাট কলোনির বাসিন্দারা বুকসমান পানিতে রয়েছেন। ঘর ছেড়ে বাসিন্দারা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকোশলী আসাফউদ্দৌলা জানান, আবাসন প্রকল্পের ঘরে জোয়ারের পানি যাতে না ডুকে সেই ব্যবস্থা করা হবে।

জোয়ারের পানিতে ভেসে আসা লাশ উদ্ধার

হাতিয়ার নিঝুমদ্বীপে কেওড়া বাগানে জোয়ারের পানিতে ভেসে আসা অজ্ঞাত ব্যক্তির অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। শুক্রবার নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের হাসি মার্কেট এলাকা থেকে লাশটি উদ্ধার করে হাতিয়া থানা ও নৌ পুলিশ। জানা গেছে, বৃহস্পতিবার জোয়ারের পানির সঙ্গে লাশ ভেসে এসে কেওড়া বাগানে আটকে থাকে। দীর্ঘদিন পানিতে থাকার কারণে লাশটি প্রায় পচে গেছে। তাই চেনা যাচ্ছে না। হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন বলেন, ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *