বর্ষা মৌসুমের আগমনী বার্তার সঙ্গেই হঠাৎ তাপমাত্রা পরিবর্তন এবং বাতাসে আর্দ্রতা বৃদ্ধির ফলে দেশের লাখ লাখ মানুষ ঋতুভিত্তিক (সিজনাল) অ্যালার্জিতে আক্রান্ত হন।
বার বার হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখে চুলকানি, নাক বন্ধ হওয়া কিংবা গলা খসখস করার মতো অস্বস্তিকর লক্ষণগুলো নিয়ে অনেকেই ভোগেন। এই সময়ে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে অনেকে তুলসী ড্রপসের মতো ঐতিহ্যবাহী ঘরোয়া উপায়ের দ্বারস্থ হচ্ছেন।
বর্ষাকালে পরিবেশগত নানা উপাদানের প্রভাবে অ্যালার্জি বেড়ে যায়। বাতাসে ভেসে বেড়ানো পরাগরেণু (পোলেন), ছত্রাকের রেণু (মোল্ড স্পোর), ধূলিকণা বা ডাস্ট মাইট এবং বায়ুদূষণের কারণে অ্যালার্জি ছড়ায়।
বাতাসে থাকা এসব উপাদান শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করলে শরীরে ‘হিস্টামিন’ নামক রাসায়নিক নিঃসৃত হয়, যা থেকে মূল অস্বস্তি ও উপসর্গগুলোর সৃষ্টি হয়।
তুলসী ড্রপস যেভাবে কাজ করে
তুলসী পাতার রস থেকে তৈরি হয় এই ড্রপস। গবেষকদের মতে, তুলসীতে বেশ কিছু শক্তিশালী উপাদান রয়েছে:
ইউজেনল: এটি প্রাকৃতিক প্রদাহনাশক ও ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে।
রোসমারিনিক অ্যাসিড: অ্যালার্জির তীব্রতা কমাতে সাহায্যকারী শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট।
ফ্ল্যাভোনয়েড: অ্যালার্জির সময়ে শ্বাসনালীর কোষে অক্সিজেনের যে চাপ তৈরি হয় (অক্সিডেটিভ স্ট্রেস), তা প্রশমিত করতে সহায়তা করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি অ্যালার্জির মূল কারণ সৃষ্টিকারী উপাদানগুলো প্রশমনে এবং শ্বাসযন্ত্রের অতিরিক্ত মিউকাস বা কফ দূর করতে সহায়ক হতে পারে।
আয়ুর্বেদ ও উদ্ভিদবিজ্ঞান বিষয়ক বেশ কিছু জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, তুলসীর কিছু উপাদান শ্বাসনালীর ফোলার ভাব কমাতে সাহায্য করে। এটি কাশি ও শ্বাসনালীর অস্বস্তি কমাতেও সহায়ক।
তবে গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন যে, মানুষ বা অ্যালার্জিক রাইনাইটিসে আক্রান্ত রোগীদের ওপর সরাসরি তুলসী ড্রপসের কার্যকারিতা নিয়ে মানবদেহে গবেষণার পরিধি এখনো সীমিত। এটি কেবল সাময়িক আরাম দিতে পারলেও কোনো মূল চিকিৎসা নয়।
তুলসী যা করতে পারে: হালকা গলার অস্বস্তি প্রশমন, শ্বাসযন্ত্রে কিছুটা স্বস্তি এনে দেওয়া এবং সামগ্রিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সচল রাখা।
তুলসী যা করতে পারে না: অ্যালার্জি পুরোপুরি নিরাময় করা, তীব্র অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন প্রতিরোধ করা কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শকৃত অ্যান্টিহিস্টামিন ওষুধের বিকল্প হওয়া।
অ্যালার্জি এড়াতে ৭টি কার্যকর ঘরোয়া পরামর্শ
ওষুধ বা সম্পূরক গ্রহণের পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনলে অ্যালার্জি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব:
১. জানালা বন্ধ রাখা: বর্ষার দিনে বাতাসে অ্যালার্জেন ও পোলেন বেশি থাকলে ঘরের জানালা বন্ধ রাখুন।
২. বাইরে থেকে ফিরে গোসল: বাইরে ঘুরে আসার পর ত্বক বা চুলে জমে থাকা অ্যালার্জেন ধুয়ে ফেলতে গোসল করে নিন।
৩. স্যালাইন ওয়াশ: চিকিৎসকের পরামর্শে নরমাল স্যালাইন দিয়ে নাক পরিষ্কার করতে পারেন।
৪. ঘরের পরিচ্ছন্নতা: এয়ার ফিল্টার, কার্পেট এবং বিছানার চাদর নিয়মিত পরিষ্কার করে ডাস্ট মাইট মুক্ত রাখুন।
৫. ঘরের আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ: ঘরের ভেতরের আর্দ্রতা ৫০ শতাংশের নিচে রাখার চেষ্টা করুন, যাতে ছত্রাক না জন্মায়।
৬. মাস্ক ব্যবহার: দূষিত বা অ্যালার্জিপ্রবণ এলাকায় যাতায়াতের সময় মাস্ক পরুন।
৭. প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণ: চিকিৎসকের দেওয়া অ্যান্টিহিস্টামিন বা নেসাল স্প্রে নিয়মিত ব্যবহার করুন।
সতর্কতা ও ডাক্তারের পরামর্শ
প্রাকৃতিক উপাদান হলেও এটি শতভাগ ঝুঁকিহীন নয়। তুলসীর গাঢ় নির্জাস থেকে কারো কারো ত্বকে র্যাশ বা গলায় অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া যারা ডায়াবেটিসের ওষুধ খাচ্ছেন, কিংবা গর্ভবতী নারী ও জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের তুলসী ড্রপস গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ ধরা, একটানা কাশি বা অতিরিক্ত সাইনাসের ব্যথা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
সূত্র: এনডিটিভি

