১২ জুন ২০২৬, শুক্র

বিতর নামাজ আদায়ের পর কি তাহাজ্জুদ পড়া যাবে?

দিনের ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর পৃথিবীর হাজারো ব্যস্ততার শেষে যখন গভীর রাত নেমে আসে, তখন আল্লাহর প্রিয় বান্দারা উঠে দাঁড়ান তাহাজ্জুদের সিজদায়। নীরব রাতের সেই মুহূর্তে রবের সঙ্গে বান্দার যে হৃদ্যতা সৃষ্টি হয়, তা অন্য কোনো ইবাদতে অনুভব করা কঠিন। আর সেই রাতের ইবাদতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিতরের নামাজ।
তবে অনেক মুসল্লির মনে একটি সাধারণ প্রশ্ন ঘুরপাক খায়— যদি এশার পর বিতর নামাজ পড়ে নেওয়া হয়, তাহলে কি পরে ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদ পড়া যাবে? নাকি তাহাজ্জুদের জন্য বিতর নামাজ শেষ রাতে রেখে দিতে হবে?

এই বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলামী শরিয়তের নির্দেশনা জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সালাত— মুমিনের জীবনের শ্রেষ্ঠ ইবাদত

ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে দ্বিতীয় স্তম্ভ হলো সালাত বা নামাজ। পবিত্র কুরআনে বহুবার নামাজ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

فَإِذَا قَضَيْتُمُ الصَّلَاةَ فَاذْكُرُوا اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَىٰ جُنُوبِكُمْ ۚ فَإِذَا اطْمَأْنَنْتُمْ فَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ ۚ إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَوْقُوتًا

‘অতঃপর যখন তোমরা সালাত সম্পন্ন করবে, তখন দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করবে। আর যখন তোমরা নিশ্চিন্ত হবে, তখন যথারীতি সালাত কায়েম করবে। নিশ্চয়ই সালাত মুমিনদের ওপর নির্ধারিত সময়ে ফরজ করা হয়েছে।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১০৩)

শুধু নামাজ পড়াই নয়, বরং নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায় করাও আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় আমল।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন—

أَيُّ الْعَمَلِ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ؟ قَالَ: الصَّلَاةُ عَلَى وَقْتِهَا

আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি?’ তিনি বললেন— ‘সময়ের মধ্যে সালাত আদায় করা।’

আমি বললাম, এরপর কোনটি? তিনি বললেন— ‘পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার।’

আমি বললাম, এরপর কোনটি? তিনি বললেন— ‘আল্লাহর পথে জিহাদ।’ (বুখারি৫০২)

বিতর নামাজের গুরুত্ব ও আদায়ের নিয়ম

এশার ফরজ ও সুন্নত নামাজের পর বিতর নামাজ আদায় করা হয়। তিন রাকাত বিতর নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে প্রথম দুই রাকাত শেষে তাশাহহুদ পড়ে বসতে হয়। এরপর সালাম না ফিরিয়ে তৃতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়াতে হয়।

তৃতীয় রাকাতে সুরা ফাতিহা ও অন্য একটি সুরা পড়ার পর তাকবির বলে দুই হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে আবার হাত বাঁধতে হয়। এরপর দোয়া কুনুত পাঠ করে রুকু, সিজদা ও শেষ বৈঠক সম্পন্ন করে সালাম ফিরাতে হয়।

বিতরকে রাতের শেষ নামাজ হিসেবে রাখার নির্দেশ

রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলমানদের রাতের শেষ নামাজ হিসেবে বিতর আদায় করতে উৎসাহিত করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত—

اجْعَلُوا آخِرَ صَلَاتِكُمْ بِاللَّيْلِ وِتْرًا

‘তোমরা রাতের শেষ সালাত হিসেবে বিতরকে নির্ধারণ করো।’ (বুখারি ৯৯৮)

এ কারণে যারা নিশ্চিতভাবে জানেন যে তারা শেষ রাতে তাহাজ্জুদের জন্য জাগবেন, তাদের জন্য উত্তম হলো তাহাজ্জুদের পর বিতর আদায় করা।
বিতর নামাজের ফজিলত

হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

يَا أَهْلَ الْقُرْآنِ أَوْتِرُوا، فَإِنَّ اللَّهَ وِتْرٌ يُحِبُّ الْوِتْرَ

‘হে কুরআনের অনুসারীরা! তোমরা বিতর আদায় করো। কারণ আল্লাহ বেজোড় এবং তিনি বেজোড়কে ভালোবাসেন।’ (আবু দাউদ ১৪১৬)

রাসুল (সা.)-এর আমলে বিতর ও তাহাজ্জুদ

হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন—

كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يُصَلِّي مِنَ اللَّيْلِ وَأَنَا مُعْتَرِضَةٌ بَيْنَ يَدَيْهِ، فَإِذَا أَرَادَ أَنْ يُوتِرَ أَيْقَظَنِي فَأَوْتَرْتُ

‘রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতে নামাজ আদায় করতেন। আমি তার সামনে শুয়ে থাকতাম। তিনি যখন বিতর পড়ার ইচ্ছা করতেন, তখন আমাকে জাগিয়ে দিতেন এবং আমিও বিতর আদায় করতাম।’ (বুখারি ৯৯৭)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাধারণত তাহাজ্জুদের পর বিতর আদায় করতেন।

বিতর পড়ে ফেললে কি পরে তাহাজ্জুদ পড়া যাবে?

এখানেই অনেক মুসল্লির মনে প্রশ্ন দেখা দেয়। কেউ যদি এশার সময়ই বিতর নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে যান, পরে রাতের শেষভাগে ঘুম ভেঙে গেলে কি তিনি তাহাজ্জুদ পড়তে পারবেন?

এ বিষয়ে ইসলামিক স্কলারদের মত হলো— যদি কারও শেষ রাতে জাগার ব্যাপারে নিশ্চিত ধারণা না থাকে, তাহলে তিনি এশার পরই বিতর আদায় করে নিতে পারেন। এরপর যদি আল্লাহর ইচ্ছায় রাতের শেষভাগে ঘুম ভেঙে যায়, তাহলে তিনি তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে নতুন করে আর বিতর পড়ার প্রয়োজন নেই। কারণ এক রাতে দুইবার বিতর আদায়ের বিধান নেই। তবে নিয়মিত অভ্যাস হিসেবে এমন না করে, যাদের শেষ রাতে জাগার সম্ভাবনা বেশি, তাদের জন্য তাহাজ্জুদের পর বিতর আদায় করাই উত্তম।

বিতর নামাজ রাতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) এটিকে রাতের শেষ নামাজ হিসেবে আদায় করতে উৎসাহিত করেছেন। তবে কেউ যদি ঘুম থেকে উঠতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে অনিশ্চিত থাকেন, তাহলে এশার পরই বিতর পড়ে নেওয়া উত্তম। আর পরে যদি আল্লাহর রহমতে ঘুম ভেঙে যায়, তাহলে তিনি নিশ্চিন্তে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতে পারবেন।

ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই— এটি মানুষের সামর্থ্য, বাস্তবতা ও প্রয়োজনকে বিবেচনায় রেখে সহজ পথ নির্দেশ করে। তাই বিতর পড়ে ফেললেও তাহাজ্জুদের দরজা বন্ধ হয়ে যায় না; বরং রাতের নির্জনতায় আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ তখনও উন্মুক্ত থাকে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নিয়মিত তাহাজ্জুদ ও বিতরের মতো গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদতের মাধ্যমে তার নৈকট্য অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *