26 Jul 2026, Sun

বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেল ভারতের তীর্থস্থান সারনাথ

ভারতের উত্তর প্রদেশে অবস্থিত প্রাচীন বৌদ্ধ তীর্থস্থান সারনাথ ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪৮তম অধিবেশনে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর ফলে ভারতের ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্য স্থানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫টিতে।

ইউনেস্কোর দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক ও প্রতিনিধি টিম কার্টিস এ স্বীকৃতিকে ভারত সরকার ও জনগণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে ভারত সরকার ও জনগণকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। আড়াই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে সারনাথ বিশ্বের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য তীর্থস্থান ও অনুপ্রেরণার উৎস। এখানেই গৌতম বুদ্ধ প্রথম ধর্মদেশনা দেন, যেখানে তিনি করুণা, প্রজ্ঞা ও শান্তির বাণী প্রচার করেছিলেন। সেই শিক্ষা আজও বিশ্বজুড়ে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সারনাথের মন্দির, স্তূপ ও বিহার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের বিশ্বাস, ভক্তি এবং অভিন্ন মানবিক ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে। এই অসাধারণ ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।’

বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন জনবসতিপূর্ণ নগরী বারাণসীতে অবস্থিত সারনাথের প্রত্নতাত্ত্বিক ও স্থাপত্য নিদর্শনগুলোই এই বিশ্ব ঐতিহ্য সম্পদের অন্তর্ভুক্ত। বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে বোধিলাভের পর গৌতম বুদ্ধ সারনাথে এসে তাঁর প্রথম পাঁচ শিষ্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং সেখানেই প্রথম ধর্মদেশনা দেন। বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে এই ঘটনাকে ধর্মচক্র প্রবর্তনের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে সারনাথ বৌদ্ধ শিক্ষা, গবেষণা ও তীর্থযাত্রার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। বিভিন্ন রাজা, দাতা ও বৌদ্ধ ভিক্ষু সম্প্রদায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে অসংখ্য স্তূপ, মন্দির ও বিহার নির্মিত হয়। ফলে সারনাথ বিশ্বের চারটি প্রধান বৌদ্ধ তীর্থস্থানের একটি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

উত্তর প্রদেশ পর্যটন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৮ সালের ৩ জুলাই সারনাথকে ইউনেস্কোর প্রাথমিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। প্রায় ২৮ বছর পর এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব ঐতিহ্য স্থানের মর্যাদা পেল। এর আগে রাজ্যের তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান ছিল— তাজমহল, আগ্রা ফোর্ট ও ফতেহপুর সিক্রি—যেগুলো আগ্রা অঞ্চলে অবস্থিত।

সারনাথ সেই পবিত্র ভূমি, যেখানে বোধিলাভের পর প্রভু বুদ্ধ মানবজাতির উদ্দেশ্যে তাঁর প্রথম ধর্মদেশনা দেন এবং ‘ধর্মচক্র প্রবর্তন’ শুরু করেন। প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থে এটি ‘ঋষিপত্তন’ নামেও উল্লেখিত।

মনোনয়নের কয়েক মাস আগে, ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ (এএসআই) সাইটটির ইতিহাস সংশোধনের অংশ হিসেবে পূর্বের ফলকটি পরিবর্তন করে। এতে ঔপনিবেশিক শাসকদের পরিবর্তে স্থানীয় রাজপরিবারকে আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেওয়া হয়।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ জানায়, ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদদের কৃতিত্ব দেওয়ার প্রচলিত ধারণা বদলানোর একটি প্রস্তাব আনা হয়েছিল।

জগত সিংহের বংশধর প্রদীপ নারায়ণ সিংহ এক বিবৃতিতে জানান, “প্রামাণ্য নথি ও প্রাথমিক ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণের পর এএসআই স্বীকার করেছে যে, বারাণসীর সারনাথ প্রথম আলোচনায় আসে বাবু জগত সিংহের নির্দেশে পরিচালিত খননের মাধ্যমে।”

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক্স-এ এক পোস্টে বলেন, “সারনাথ প্রভু বুদ্ধের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, যার জ্ঞান, করুণা ও সম্প্রীতির বার্তা বিশ্বকে অনুপ্রাণিত করে। এই স্বীকৃতি ভারতের গভীর সভ্যতা ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের উদযাপন।”

সংরক্ষণ স্থপতি অভা নারায়ণ লাম্বা, যিনি সারনাথের ইউনেস্কো মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বলেন, “সারনাথের পরিচয় শুধু এর স্থাপত্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে এখানে বৌদ্ধ তীর্থযাত্রার ঐতিহ্য জীবন্ত রয়েছে—এই সমন্বিত সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যই সারনাথকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদার জন্য অনন্যভাবে যোগ্য করে তুলেছে।”

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *