২১ জুন ২০২৬, রবি

‘রোমাঞ্চকর’ গোলশূন্য ড্রয়ে কুরাসাওয়ের ইতিহাস

রোমাঞ্চকর গোলশূন্য ড্র। কথাটা কি প্যারাডক্সিকাল ঠেকছে খানিকটা? লাগারই কথা। ফুটবল যে গোলের খেলা। এখানে সাফল্যের পূর্বশর্তই হলো ‘গোল’।
তবে প্রচলিত সে ধারণাটাকে ভালোভাবেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে মাত্র ১৭১ বর্গমাইল আয়তনের দেশ কুরাসাও। জয় ছাড়াই যে লেখা হয়ে গেছে তাদের ইতিহাস। স্কোরবোর্ড বলছে শূন্য-শূন্য। গোল নেই, জয়ও নেই। কিন্তু সেটা বিশ্বকাপের সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে পয়েন্ট তুলে নেওয়ার পথ আগলে দাঁড়াতে পারেনি আদৌ।

প্রশ্ন জাগে—গোলশূন্য ড্র কি আদৌ রোমাঞ্চকর হতে পারে? পরিসংখ্যানের চোখে তো এটা স্রেফ একটা পয়েন্ট ভাগাভাগি। কিন্তু ফুটবল তো শুধু সংখ্যার খেলা নয়, এ তো এক আবেগের ভাষাও বটে! আর সেই ভাষাতেই কুরাসাও বনাম ইকুয়েডর ম্যাচটা যেন একটা মহাকাব্য লিখে ফেলল।

ম্যাচের তখন ৮০ মিনিট। ইকুয়েডরের বদলি খেলোয়াড় অ্যাঙ্গুলো বক্সের বাইরে থেকে যে শটটা নিলেন, সেটা ছিল রীতিমতো রকেট। গ্যালারির হাজারো চোখ বলটার দিকে, গোল তো প্রায় নিশ্চিত! কিন্তু ঠিক তখনই, যেন সময় থমকে গেল এক মুহূর্তের জন্য।

এক নীল ছায়ামূর্তি শূন্যে ভেসে উঠল। এলয় রুম বলটা ঠেকিয়ে দিলেন অবলীলায়। এটা ছিল তার ১৫তম সেভ। বিশ্বকাপের ৯০ মিনিটের ম্যাচে সর্বোচ্চ সেভের রেকর্ড।

৩৭ বছর বয়সী এলয় রুম, এ আবার কে? নামটা শুনে অনেকেই হয়তো ভ্রু কুঁচকেছেন। ইনি মায়ামির হয়ে খেলেন, কিন্তু সেই চেনা মায়ামি নয় যেটা আপনার মাথায় এই মাত্র এলো। ইনি খেলেন মায়ামি এফসি-তে—যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বিভাগ, ইউএসএল চ্যাম্পিয়নশিপে।

যে গোলরক্ষক আজ রাতে ইকুয়েডরের মতো দলকে রুখে দিলেন, তিনি কোনো গ্ল্যামারাস ক্লাবের তারকা নন। অখ্যাত লিগের এক যোদ্ধা, যিনি নিজের জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপালেই হয়ে ওঠেন প্রাচীরের মতো অটল।

এই গল্প নতুন নয় অবশ্য। ২০১৯ কনকাকাফ গোল্ড কাপেও তিনি এমনই এক পারফর্ম্যান্স দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে। কুরাসাও সেদিন ১-০ ব্যবধানে হারলেও রুম এমন অতিমানব হয়ে উঠেছিলেন যে, তাই দেখে এমএলএসের দল কলম্বাস ক্রু তাকে দলে ভেড়ায় দ্রুত।

আজকের রাতটা আসলে সেই ম্যাচেই দ্বিতীয় পর্ব। এই পারফর্ম্যান্স বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা প্রতিভার বিস্ফোরণ, যা অবশেষে বিশ্বমঞ্চে আলোড়ন তুলল।

কিন্তু শুধু রুম একা তো ম্যাচ জেতান না; মানে, এখানে তো জেতাননি, ড্র করিয়েছেন, কিন্তু এই ড্র যেন জয়ের চেয়েও বড়।

হ্যাঁ, জয়ের চেয়ে বড়ই বটে। ক্যারিবিয়ান সাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কুরাসাও, যাদের জনসংখ্যা দেড় লাখের একটু বেশি। এই দেশ প্রথমবারের মতো এসেছে বিশ্বকাপে, আর প্রথম ম্যাচেই বড় হারের পর আজ রাতে তারা যা করে দেখাল, তাকে শুধুই একটা একটা পয়েন্ট অর্জন হিসেবে দেখলে খাটো করেই দেখা হবে বোধ করি। কারণ আজকের এই ড্র ছোট্ট দ্বীপদেশটিতে নিশ্চয়ই জাতীয় উৎসবের জন্ম দিয়ে ফেলেছে এতোক্ষণে। এমন একটা মুহূর্ত, যা তাদের নাতি-নাতনিরাও মনে রাখবে।

তাই যখন কেউ জিজ্ঞেস করবে, গোলশূন্য ড্রও কি রোমাঞ্চকর হতে পারে? উত্তরটা হবে, হ্যাঁ; যদি সেই শূন্যের পেছনে থাকে এমন সব গল্প।

স্কোরবোর্ড বলবে ০-০। কিন্তু কানসাস সিটির সেই রাতের গল্প বলবে অন্য কিছু। বিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্প, এক প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার গল্প। আর সেই গল্পে গোল না হওয়াটাই যেন হয়ে উঠল সবচেয়ে বড় ‘গোল’, যে গোলটা আসলে করল কুরাসাও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *