এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি ব্যক্তি ও ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছে ৩ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা বা ৪১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ২০২৫ সালে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা (৮৩ কোটি ৪২ লাখ সুইস ফ্রাঁ)। ২০২৪ সালে বাংলাদেশিদের জমা ছিল ৮ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা বা ৫৮ কোটি ৯৫ লাখ ফ্রাঁ।
আগের বছর ২০২৩ সালে আমানত ছিল ২৬৪ কোটি টাকা। ২০২২ সালে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ ছিল ৮২৪ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে আমানত বৃদ্ধি হয়েছিল ৩২৪৬ শতাংশ।
২০২৫ সালের আমানতের পরিমাণ এখন পর্যন্ত রেকর্ড হওয়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এ বৃদ্ধির ফলে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের মোট আমানত ২০২১ সালের সর্বোচ্চ ১২ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকার (৮৭ কোটি ১১ লাখ সুইস ফ্রাঁ) রেকর্ডের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে।
সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এ তথ্য সুইস ব্যাংকগুলো কর্তৃক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকে জমা দেওয়া সরকারি হিসাবের তথ্য। এটি সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশিদের কথিত ‘কালোটাকা’র প্রকৃত পরিমাণ নির্দেশ করে না।
২০২৫ সালে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর সুইস ব্যাংকে রাখা আমানত ৪১ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেড়ে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৫৮ কোটি ৯৫ লাখ সুইস ফ্রাঁ। মোট আমানতের প্রায় ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশই ছিল বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর, যা ২০২৪ সালে ছিল ৯৭ দশমিক ৮ শতাংশ। অথচ ২০২৩ সালে এ হার ছিল মাত্র ২০ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৩৫ শতাংশ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর রাখা অর্থ মূলত স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের অংশ।’ তাঁর ভাষায়, ‘ব্যাংকগুলো কোথায় ভালো মুনাফা পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিনিয়োগের সুযোগ ও রিটার্নের ওপর নির্ভর করে ব্যাংকগুলো নিয়মিত বিভিন্ন দেশে অর্থ স্থানান্তর করে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট বছরে সুইজারল্যান্ডে বেশি অর্থ রাখা হয়েছে মানেই অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছে এমন ধারণা সঠিক নয়।’
অন্যদিকে ব্যক্তিগত হিসাবের মাধ্যমে রাখা বাংলাদেশিদের আমানত প্রায় ১০ শতাংশ কমে ১১ দশমিক ৪ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ হয়েছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ১২ দশমিক ৬ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। একসময় গ্রাহকের গোপনীয়তার জন্য পরিচিত সুইস ব্যাংকগুলো বর্তমানে অর্থ পাচার ও করফাঁকি রোধে অধিক স্বচ্ছতা নীতি অনুসরণ করছে।
এ লক্ষ্যে ২০১৮ সালে অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন (এএইওআই) কার্যক্রম চালু করা হয়। এর আওতায় বিভিন্ন দেশের কর কর্তৃপক্ষ বিদেশে নাগরিকদের আর্থিক হিসাব সম্পর্কিত তথ্য আদানপ্রদান করতে পারে। ২০২৫ সালে সুইস ফেডারেল ট্যাক্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফটিএ) বিশ্বের ১০১ দেশের সঙ্গে প্রায় ৩৪ লাখ আর্থিক হিসাবের তথ্য বিনিময় করেছে।
তবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) গ্লোবাল ফোরামের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশ এখনো এএইওআইয়ে অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেয়নি। বিপরীতে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তান ইতোমধ্যে এ তথ্য বিনিময় ব্যবস্থার অংশ।
২০২৫ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সুইস ব্যাংকে সর্বোচ্চ আমানত রয়েছে ভারতের। ভারতীয় ব্যক্তি ও ব্যাংকগুলোর মোট আমানত ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ, যদিও তা আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ কমেছে।
বাংলাদেশ ৮৩৪ দশমিক ২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এবং বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে একমাত্র উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অন্যদিকে শতকরা হিসাবে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে আফগানিস্তানের, যেখানে আমানত ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ হয়েছে। তবে মোট অঙ্কের দিক থেকে তা এখনো খুবই সীমিত।
সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। ২০২৫ সালে ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, ভুটানসহ কয়েকটি দেশের আমানত কমলেও বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপের আমানত বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি আমানতের সাম্প্রতিক উল্লম্ফনের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর আমানত বৃদ্ধি। ফলে এ পরিসংখ্যানকে সরাসরি অবৈধ অর্থ বা কালো টাকার সূচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না থাকায় বিদেশে বাংলাদেশিদের আর্থিক সম্পদের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া এখনো কঠিন।

