২৪ মে ২০২৬, রবি

কানাডা থেকে আলাদা হওয়া নিয়ে অক্টোবরে আলবার্টায় গণভোট

কানাডার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও বড় ধরনের ঐক্যের পরীক্ষা হতে যাচ্ছে আগামী অক্টোবর মাসে। দেশটির খনিজ তেলসমৃদ্ধ পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ আলবার্টা কানাডার অংশ হিসেবে থাকবে, নাকি আনুষ্ঠানিকভাবে আলাদা হওয়ার বা স্বাধীনতার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করবে—তা নির্ধারণে আগামী ১৯ অক্টোবর একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

গত কয়েক দশকের মধ্যে দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় এটিই কানাডার জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) এক টেলিভিশন ভাষণে আলবার্টা প্রাদেশিক সরকার প্রধান ড্যানিয়েল স্মিথ এই ঐতিহাসিক গণভোটের ঘোষণা দেন। তবে তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে একটি ঐক্যবদ্ধ কানাডার পক্ষে এবং দেশ ভাঙার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বলে ভাষণে স্পষ্ট করেন। মূলত বিগত কয়েক বছর ধরে প্রদেশটিতে বাড়তে থাকা বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব এবং এক নাগরিক পিটিশনে ৩ লাখেরও বেশি মানুষের স্বাক্ষরের প্রেক্ষিতেই এই গণভোটের আয়োজন করতে বাধ্য হচ্ছে সরকার।

এই গণভোটে ভোটারদের সামনে সাধারণ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’—এমন কোনো সহজ প্রশ্ন রাখা হচ্ছে না। ব্যালটে ভোটারদের দুটি বিকল্প বা বক্স দেওয়া হবে। প্রথম বিকল্প (অপশন এ) থাকবে কানাডার সাথে থেকে যাওয়ার পক্ষে। আর দ্বিতীয় বিকল্পটি (অপশন বি) হবে কানাডার সংবিধান অনুযায়ী আলবার্টার বিচ্ছিন্ন বা স্বাধীন হওয়ার জন্য একটি চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার পক্ষে।

এই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছেন বনিভিলের এক অস্ত্র ব্যবসায়ী মিচ সিলভেস্ট্রে এবং ক্যালগারির আইনজীবী জেফরি রাথ। তারা ‘আলবার্টা প্রসপারিটি প্রজেক্ট’ নামক একটি গোষ্ঠীর সদস্য। তাদের মূল অভিযোগ, কানাডার কেন্দ্রীয় লিবারেল পার্টির দীর্ঘদিনের পরিবেশ ও অর্থনৈতিক নীতির কারণে তেলসমৃদ্ধ এই প্রদেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।

তাদের দাবি, আলবার্টা ফেডারেল সরকারকে যে পরিমাণ রাজস্ব দেয়, সেই তুলনায় অনেক কম সুবিধা পায়। অথচ অটোয়া (কানাডার রাজধানী) তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মাত্রাতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করে। এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ‘পশ্চিমা বিচ্ছিন্নতাবোধ’ বা অবহেলিত হওয়ার ক্ষোভ থেকেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত।

তবে স্বাধীনতাকামীদের সবার লক্ষ্য এক নয়। কেউ কেউ স্বাধীনতাকে অটোয়ার কাছ থেকে দাবি আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চান, কেউ সরাসরি সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ চান, আবার কেউ কেউ আমেরিকার সাথে যোগ দেওয়ার পক্ষে। বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা জেফরি রাথের দাবি, আলবার্টার সংস্কৃতির সাথে কানাডার চেয়ে আমেরিকার বেশি মিল রয়েছে। এই উদ্দেশ্যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাথে ওয়াশিংটনে একাধিক গোপন বৈঠকও করেছেন বলে জানা গেছে।

অবশ্য এই গণভোটের পথ এতটা মসৃণ ছিল না। চলতি মাসের শুরুর দিকে আলবার্টার একটি আদালত নাগরিকদের ওই বিচ্ছিন্নতাবাদী পিটিশনটি বাতিল করে দিয়েছিলেন। বিচারক রায়ে বলেন, যে আদিবাসী ‘ফার্স্ট নেশনস’ সম্প্রদায়ের জমির ওপর এই স্বাধীনতার প্রক্রিয়া বা ভূখণ্ড দাঁড়িয়ে আছে, তাদের সাথে কোনো প্রকার আলোচনা না করেই এই গণভোটের আয়োজন করা হচ্ছিল, যা অবৈধ। আদালতের এই রায়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ বলেন, একজন বিচারকের রায়ের জন্য তিনি লাখ লাখ মানুষের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হতে দেবেন না। সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে এবং অন্তর্বর্তী সময়ে এই গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ককে ঝুলিয়ে না রেখে জনগণের মুখোমুখি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে আদিবাসী নেতারা একে ‘অগণতান্ত্রিক’ ও ‘স্বৈরাচারী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এদিকে বিচ্ছিন্নতাবিরোধী ‘ফরএভার কানাডিয়ান’ নামক আরেকটি পাল্টা পিটিশনে প্রায় ৪ লাখ আলবার্টাবাসী স্বাক্ষর করেছেন, যা স্বাধীনতার পক্ষের পিটিশনের চেয়েও বেশি। উল্লেখ্য, আলবার্টার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৫০ লাখের কিছু বেশি।

গণভোটের এই ঘোষণার পর আগামী পাঁচ মাস পক্ষে-বিপক্ষে জোর প্রচারণা চলবে। এদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আলবার্টাকে কানাডার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির নেতা পিয়ের পোইলিভরেও দেশের ঐক্যের পক্ষে প্রচার চালাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। অন্যদিকে, ব্যালটের প্রশ্নটি সরাসরি স্বাধীনতার পক্ষে না হয়ে আইনি প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কট্টর বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা জেফরি রাথ। তিনি প্রিমিয়ার স্মিথের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার হুমকি দিয়েছেন।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত জরিপ অনুযায়ী, আলবার্টার অধিকাংশ মানুষই কানাডার সাথে থাকার পক্ষে। চলতি বছরের জানুয়ারি ও মার্চ মাসে পরিচালিত ইপসস এবং অ্যাবাকাস ডাটা এর জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৬ থেকে ২৮ শতাংশ মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিতে পারেন। ফলে চূড়ান্ত বিচ্ছেদের সম্ভাবনা কম থাকলেও, আগামী অক্টোবরের এই ভোট কানাডার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *