মানবজাতির ইতিহাসে ত্যাগের যে মহান অধ্যায় চিরদিন উজ্জ্বল হয়ে আছে, তার অন্যতম প্রতীক হলো কোরবানি। এটি কেবল পশু জবাইয়ের নাম নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের প্রিয় বস্তু বিসর্জন দেওয়ার এক অনন্য ইবাদত। মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে ঈদুল আজহার যে আনন্দ ও আবেগ প্রবাহিত হয়, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগ এবং হজরত ইসমাইল (আ.)-এর অনুপম আনুগত্যের ইতিহাস। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করো এবং কোরবানি করো।’ (সুরা কাউসার : ২) এ আয়াত প্রমাণ করে নামাজের মতো কোরবানিও একটি মহান ইবাদত। ইসলামের প্রতিটি বিধানের পেছনে যেমন রয়েছে গভীর তাৎপর্য, তেমনি কোরবানির মাঝেও নিহিত রয়েছে ইমান, তাকওয়া, ভ্রাতৃত্ব, মানবতা এবং আত্মশুদ্ধির মহান শিক্ষা ও অনন্য বিধান।
কোরবানির গুরুত্ব ও ফজিলত : কোরবানি ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য এটি ওয়াজিব। রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যার সামর্থ্য আছে অথচ সে কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।’ (ইবনে মাজাহ) এই হাদিস কোরবানির গুরুত্বকে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে তুলে ধরে। কোরবানির মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। হাদিসে এসেছে, ‘কোরবানির দিনের আমলসমূহের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো রক্ত প্রবাহিত করা (কোরবানি করা)।’ (তিরমিজি) কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে সওয়াব দান করা হবে বলেও হাদিসে সুসংবাদ এসেছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, এটি নিছক সামাজিক প্রথা নয়; বরং আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত।
কোরবানির প্রকৃত তাৎপর্য : আজ অনেকের কাছে কোরবানি হয়ে গেছে লোকদেখানো প্রতিযোগিতা কিংবা সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের মাধ্যম। অথচ কোরআন আমাদের ভিন্ন শিক্ষা দেয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না তাদের গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ : ৩৭) এই আয়াত কোরবানির মূল দর্শন স্পষ্ট করে দিয়েছে। আল্লাহ মানুষের বাহ্যিক চাকচিক্য দেখেন না; তিনি দেখেন অন্তরের একনিষ্ঠতা ও তাকওয়া। তাই কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো নিজের নফস, অহংকার, লোভ ও স্বার্থপরতাকে আল্লাহর আদেশের সামনে উৎসর্গ করা। হজরত ইবরাহিম (আ.) যখন প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার স্বপ্ন দেখলেন, তখন তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। আর ইসমাইল (আ.)-ও বলেছিলেন, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা পালন করুন। ইনশা আল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’ (সুরা সফফাত : ১০২) এ যেন আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত।
প্রতীককোরবানি কবুল হওয়ার শর্ত : কোরবানি কবুল হওয়ার জন্য কয়েকটি মৌলিক শর্ত রয়েছে। প্রথমত ইখলাস বা একনিষ্ঠতা থাকতে হবে। কোরবানি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে। লোকদেখানো, অহংকার বা সামাজিক মর্যাদার উদ্দেশ্যে কোরবানি করলে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। দ্বিতীয়ত হালাল উপার্জন দ্বারা কোরবানি করতে হবে। হারাম সম্পদ দিয়ে ইবাদত কবুল হয় না। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র জিনিস ছাড়া গ্রহণ করেন না।’ (সহিহ মুসলিম) তৃতীয়ত পশু হতে হবে শরিয়ত নির্ধারিত বয়স ও ত্রুটিমুক্ত। অসুস্থ, অন্ধ, পঙ্গু বা দুর্বল পশু কোরবানির জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। চতুর্থত কোরবানি করতে হবে নির্ধারিত সময়ে এবং শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী।
মুসলমানদের জন্য শিক্ষণীয় দিক : কোরবানি মুসলমানকে ত্যাগের শিক্ষা দেয়। মানুষ স্বভাবতই সম্পদ ভালোবাসে, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সেই সম্পদ ব্যয় করার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত সফলতা। কোরবানি আমাদের ভ্রাতৃত্ববোধ শেখায়। ধনী-গরিব সবাই একসঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে। কোরবানির গোশত আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও অসহায় মানুষের মাঝে বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে ভালোবাসা ও সহমর্মিতা সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া কোরবানি মানুষকে আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয়। যেমন পশু জবাই করা হয়, তেমনি মানুষের অন্তরের পশুত্ব-হিংসা, অহংকার, লোভ ও স্বার্থপরতাকেও জবাই করতে হবে। কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন মানুষের চরিত্রে তাকওয়া, মানবতা ও আল্লাহভীতি বৃদ্ধি পাবে। আজ মুসলিম সমাজ নানা সংকট, বিভেদ ও স্বার্থপরতায় আক্রান্ত। কোরবানির শিক্ষা যদি বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হতো, তবে সমাজে শান্তি, সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হতো।
পরিশেষে বলা যায়, কোরবানি কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ইমানের পরীক্ষা, আত্মত্যাগের মহড়া এবং আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের প্রতীক। তাই আসুন, আমরা বাহ্যিক আয়োজনের চেয়ে অন্তরের তাকওয়াকে প্রাধান্য দিই এবং কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা নিজেদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করি। তাহলেই আমাদের কোরবানি হবে কবুলের উপযুক্ত এবং আমাদের জীবন হবে আল্লাহর সন্তুষ্টিময়।
♦ লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা

