অতীব মর্যাদাপূর্ণ মাস হলো রমজানুল মোবারক। দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে রমজানের রোজা ফরজ হয়। রমজান আল্লাহ তাআলার অবারিত রহমত, মাগফিরাত ও করুণা লাভের মাস। রমজানের রোজা আত্মার পরিশুদ্ধি ও প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণে শক্তি সঞ্চার করে।
এ মাসেই পবিত্র কোরআন নাজিল হয়েছে। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর ওপর ফরজ। রমজানের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম সমাজের ঘরে ঘরে তারাবির নামাজ, শেষ রাতের সাহরির প্রস্তুতি ও সন্ধ্যায় ইফতারিসহ নানা আয়োজনে সাড়া জেগে ওঠে।
১. সাহরির পরিচয়
সাহরি আরবি শব্দ। এটি ‘সাহর’ বা ‘সুহুর’ থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ রাতের শেষাংশ বা ভোররাত। সাহরি অর্থ শেষ রাতের বা ভোররাতের খাবার। রাতের শেষ ভাগে যা খাওয়া হয় বা পান করা হয়। ইসলামের পরিভাষায় সিয়াম পালন করার উদ্দেশ্যে শেষ রাতে পানাহার করাকে সাহরি বলা হয়। রোজাদারের জন্য সাহরি খাওয়া সুন্নাত। সাহরিতে রয়েছে বরকত ও কল্যাণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা সাহরি খাও। কেননা সাহরিতে বরকত রয়েছে।’ (বুখারি, হাদিস : ১৮০১)
পূর্ববর্তী জাতিগোষ্ঠী তথা ইহুদি-খ্রিস্টানরাও রোজা পালন করত, কিন্তু তাদের জন্য ভোররাতে সাহরির বিধান ছিল না। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) ভোররাতে সাহরি খাওয়ার জন্য বিশেষভাবে তাগিদ দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমাদের রোজা আর আহলে কিতাবদের রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো সাহরি খাওয়া আর না খাওয়া।’ (মুসলিম, হাদিস : ১০৯৬)
২. সাহরির সময়
সাহরি শুরু হওয়ার সময়ের ব্যাপারে মতপার্থক্য রয়েছে। নিশি রাতের পর থেকে সুবহে সাদেক তথা ফজর ওয়াক্তের পূর্বের সময়টাকে সাহরি বলা হয়। মোল্লা আলী কারি (রহ.) বলেন, ‘অর্ধ রাত্রি থেকে সাহরির সময় শুরু হয়ে ফজরের পূর্ব পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকে।’ (মিরকাতুল মাফাতিহ, ৪/৪১৬)
আল্লামা জামাখশারি ও ফকিহ আবুল লাঈস সমরকন্দি (রহ.) বলেন, সাহরির সময় হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। সাহরির শেষ সময়ের ব্যাপারে সবাই একমত। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আর তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ রাতের কালো রেখা থেকে উষার সাদা রেখা স্পষ্টভাবে তোমাদের কাছে প্রকাশ না হয়। তারপর রাতের আগমন পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করো। (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৭)
৩. শেষ সময়ে সাহরি খাওয়া উত্তম
আল্লাহ তাআলা আমাদের রোজার নিয়ামত দান করেছেন আর রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের সাহরির নির্দেশ দিয়ে সেটিকে কল্যাণময় ও শক্তিবর্ধনকারী খাবার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা সাহরি খাওয়ার মাধ্যমে দিনে রোজা রাখার জন্য এবং দিনে বিশ্রামের মাধ্যমে রাতে নামাজ পড়ার জন্য সাহায্য গ্রহণ করো।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৬৯৩)
শেষ সময়ের দিকে সাহরি খাওয়া উত্তম। প্রিয় নবী রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমরা নবীরা এ মর্মে আদিষ্ট হয়েছি যে সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইফতার করব এবং শেষ ওয়াক্তে সাহরি গ্রহণ করব। (আল মুজামুল আওসাত, তবারানি, হাদিস : ১৮৮৪)
৪. বরকতময় সাহরি
যারা সাহরি গ্রহণ করে তাদের ওপর আল্লাহর বিশেষ রহমত বর্ষিত হয় এবং তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভে ধন্য হন। সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বরকত তিনটি জিনিসে নিহিত রয়েছে—জামাতে নামাজ আদায়, সারিদ (ঝোলে ভেজা রুটির থালা) এবং সাহরি। (তাবারানি)
অপর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সাহরি খাওয়াতে বরকত রয়েছে। অতএব তোমরা তা ছেড়ো না; এক ঢোক পানি পান করে হলেও সাহরি গ্রহণ করো। কেননা যারা সাহরি খায় আল্লাহ তাদের ওপর রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতারা তাদের জন্য রহমতের দোয়া করতে থাকেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১১০৮৬, ১১৩৯৬)
সাহরির বরকত সম্পর্কে আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, সাহরির বরকত বিভিন্নভাবে অর্জিত হয়। যেমন-এতে রয়েছে সুন্নাতের অনুসরণ, আহলে কিতাবদের (খ্রিস্টান ও ইহুদি) থেকে বিরোধিতা, ইবাদতে তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন, শক্তি বৃদ্ধি এবং ক্ষুধার কারণে যে খারাপ মেজাজ তৈরি হতে পারে তা দূর করা, প্রার্থনাকারীকে দান-সদকা করতে বা তাদের সঙ্গে একত্র হতে খাদ্য গ্রহণে উৎসাহিত করা, এমন সময়ে মানুষকে আল্লাহকে স্মরণ করতে এবং দোয়া করতে উৎসাহিত করা যখন দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি এবং ঘুমের আগে ভুলে যাওয়া ব্যক্তির জন্য রোজার নিয়ত স্মরণ করিয়ে দেওয়া। (ফাতহুল বারি ৪/১৪০)
৫. সাহরির মাহাত্ম্য
সাহরির সময় আরামের ঘুম বর্জন করে জাগ্রত হওয়া প্রকৃতপক্ষে ইবাদত ও আনুগত্যের প্রতি অনুরাগী হওয়াকে নির্দেশ করে। এতে শেষ রাতে জাগ্রত হওয়ার কারণে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়ের সৌভাগ্য লাভ হয়। সাহরির সময় জাগ্রত হওয়া এক প্রকারের মুজাহাদা বা সাধনার বিষয়ও বটে। যারা এই বরকতময় সময়ে জাগ্রত হয়ে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করে থাকেন এবং ইস্তিগফার করেন, আল্লাহ তাঁদের স্বীয় ভালোবাসায় ধন্য করেন।
আল্লাহ তাআলা এ ধরনের প্রিয় বান্দা সম্পর্কে বলেন, তারা ধৈর্যশীল, সত্যবাদী, অনুগত, আজ্ঞাবহ, (আল্লাহর পথে) ব্যয়কারী এবং শেষ রাতে ক্ষমা প্রার্থনাকারী। (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৭)
আল্লাহ তাআলা ঈমানদার বান্দাদের প্রশংসায় আরো বলেন, তারা (ঈমানদাররা) রাতের শেষ অংশে আল্লাহর নিকট ইস্তিগফার (ক্ষমাপ্রার্থনা) করে থাকে। (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ১৮)
রাতের শেষ অংশে যেকোনো দোয়া আল্লাহ তাআলা কবুল করে নেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মহামহিম আল্লাহ তায়ালা প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন। কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আছে এমন, যে আমার কাছে চাইবে? আমি তাকে তা দেব। কে আছে এমন আমার কাছে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৪৫, ৬৩২১)
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক (ইসলাম শিক্ষা), চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজ

