তেল নিয়ে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভোগান্তি কাটতেই এবার সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাস সংকট শুরু হয়েছে। এতে গাড়িচালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। গত দেড় থেকে দুই মাস ধরেই রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোয় গ্যাসের চাপ কম। এ কারণে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত গ্যাস নিতে পারছেন না তারা। কিছু স্টেশন আবার গ্যাস না থাকায় দিনভর বন্ধ থাকছে। গ্যাস সংকটে বাসাবাড়িতেও দুর্ভোগ বেড়েছে। গৃহিণীদের দিনের রান্না এখন রাতেই করে নিতে হচ্ছে। ঢাকার কুড়িল ভাটারায় অবস্থিত পিন্যাকাল পাওয়ার সিএনজি স্টেশনটিতে গতকাল গ্যাস সংকটে সকাল থেকে সরবরাহ বন্ধ রেখেছিল। এই পাম্পের ক্যাশিয়ার মো. মান্নান বলেন, দিনের বেলা গ্যাস না থাকায় গাড়িতে গ্যাস দেওয়া বন্ধ আছে। রাতে গ্যাসের চাপ বাড়লে তখন আবার গ্যাস দেওয়া শুরু হবে। প্রগতি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের বাইরে গতকাল বিকালে গ্যাস নেওয়ার জন্য গাড়ির লাইন এক কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়। এখানে আসা গাড়িচালক আবদুস সাত্তার বলেন, ‘আমি তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু যে পরিমাণ গ্যাস পাচ্ছি তাতে দিনে দুই থেকে তিনবার গ্যাস নিতে হচ্ছে।’ এই স্টেশনের সুপারভাইজার সুমন চৌধুরী বলেন, ‘এখন ১২০ পিএসআই (প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে গ্যাস চাপের ইউনিট) চাপে গ্যাস দিতে পারছি। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চাপ না থাকায় গ্যাস দেওয়া বন্ধ ছিল। রাতে চাপ কিছুটা বাড়ে। গ্যাস নিতে আসা গাড়ির লাইন এখন অনেকদূর চলে যাচ্ছে। আটটি নজেলে আমরা গ্যাস দিচ্ছি।’
মিরপুর ১২ নম্বরে অবস্থিত সিরামিক ওয়ার্কস সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গত এক সপ্তাহ ধরে গ্যাসের জন্য গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। গ্যাসের চাপ কমে গেলে এই স্টেশনের প্রধান ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। গতকাল দুপুরে গ্যাস নিতে এই স্টেশনে গিয়ে দেখা যায় গাড়ির দীর্ঘ সারি। কিন্তু গ্যাসের চাপ কম থাকায় গাড়িচালকরা তাদের চাহিদার অর্ধেক গ্যাসও নিতে পারছিলেন না। দুপুর ৩টায় সেখানে গ্যাসের চাপ ছিল ১০০ পিএসআই। এই স্টেশনের গ্যাস সরবরাহকারী কর্মকর্তা মো. নাইম বলেন, ‘দিনে গ্যাসের চাপ থাকে না বললেই চলে। কখনো এটি ৯০-তে চলে যায়। এরপর গ্যাস দিলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। যে চালক ৬০০ টাকার গ্যাস নিতে আসছেন তাকে আমরা ২০০ টাকার গ্যাস দিতে পারছি। এখানে চারটি নজেলে এখন ১০০ চাপে গ্যাস দিচ্ছি। রাতে চাপ কিছুটা বাড়ে। লাইনে সরবরাহ কম থাকায় গ্রাহকদের চাহিদামতো গ্যাস দিতে পারছি না।’
এখানে গ্যাস নিতে আসা ব্যক্তিগত গাড়িচালক মো. মহসীন বলেন, ‘গত দেড় থেকে দুই মাস ধরে গ্যাসের এই সংকট দেখছি। ৫০০ টাকার গ্যাস নিলেই পুরো দিন আর গ্যাস নিতে হয় না। কিন্তু গ্যাসের চাপ কম থাকায় এখন ১৮০ টাকার গ্যাস নিতে পেরেছি। এজন্য প্রতিদিনই এখন দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে দুই থেকে তিনবার গ্যাস নিতে হচ্ছে। এতে সময় ও শক্তি দুই অপচয় হচ্ছে।’
বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশরেন মহাসচিব ফারহান নূর গতকাল বলেন, ‘ঢাকার বাইরে গাজীপুরে গ্যাসের চাপ নেই বললেই চলে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে গ্যাস না থাকায় সিএনজি স্টেশন বন্ধ থাকছে। সরকারের সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি বারবার জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি। লাইনে চাপ না থাকায় গ্রাহকদের গ্যাস দিতে পারছি না।’
বাসাবাড়িতে দিনের রান্না রাতে : রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকার বাসিন্দারাই এখন গ্যাস সংকটে চরম ভোগান্তিতে আছেন। দিনে চুলায় গ্যাস না পেয়ে গভীর রাতে চাপ যখন কিছুটা বাড়ে তখন রান্নার কাজ সারছেন গৃহিণীরা। কেউ কেউ গ্যাসের অভাবে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় বাসা বদল করছেন। প্রাকৃতিক গ্যাসের চুলার বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা বা এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করছেন। কেউ কেউ ঘরের বাইরেই এখন দিনের খাবার খেয়ে নিচ্ছেন।
মিরপুর ১১ নম্বরের বাসিন্দা সিদ্দিকা খাতুন বলেন, ‘সকালে গ্যাসের চাপ থাকেই না। এই তাপে পানি গরম করতেও সময় লাগে। মধ্যরাতে চাপ একটু বাড়ে। সে সময় পরের দিনের রান্না করতে হয়। গ্যাস না থাকায় এখন আর বাসায় কাউকে দাওয়াত করে খাওয়াই না।’
মিরপুর ছাড়াও মোহাম্মদপুর, রামপুরা, বনশ্রী, মগবাজার এবং পুরান ঢাকার বড় অংশে আবাসিকের গ্রাহকরা গ্যাসের অভাবে দৈনন্দিন কাজ করতে পারছেন না। তিতাস গ্যাস সূত্রে জানা যায়, দেশে এখন দৈনিক গ্যাসের চাহিদা মোট ৩ হাজার ৮শ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ করা হচ্ছে দুই হাজার ৭শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যে প্রাকৃতিব গ্যাস থেকে আসছে ১ হাজার ৬৭৩ মিলিয়ন ঘনফুট। আর এলএনজি থেকে আসছে ১ হাজার ৫১ মিলিয়ন ঘনফুট।

